প্রকাশিত

মুক্তমন ডেস্ক: সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ডুয়েল গেজ লাইন। এজন্য এ অঞ্চলের চার মন্ত্রীও দিয়েছেন আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার)। কিন্তু সিলেটবাসীর সে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।

বরং আখাউড়া-সিলেট রেলপথে বর্তমান মিটার গেজ সিঙ্গেল লাইন তুলে ফেলে নির্মাণ করা হচ্ছে ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইন।

শুধু তাই নয়, ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার এ রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে আশপাশে নির্মাণ করা এমন পথের প্রায় সাতগুণ।

নির্মাণকাজের জন্য পুরো পথে একটি অস্থায়ী রেলপথ তৈরি করা হবে, নির্মাণ কাজ শেষ হলে যা তুলে ফেলা হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।

আর খোদ রেলের প্রকৌশলীরাই বলছেন, এ সময়ে সিঙ্গেল লাইন নির্মাণ অদূরদর্শিতার চূড়ান্ত উদাহরণ।

বর্তমান মিটার গেজ লাইন অক্ষুণ্ন রেখে পাশ দিয়ে ডুয়েল গেজ রেলপথ তৈরি করা হলে ব্যয় অনেক কম হতো, সিলেটবাসীর স্বপ্নও পূরণ হতো।

‘আখাউড়া-সিলেট সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজে রূপান্তর’ প্রকল্পটি গত বছর এপ্রিলে অনুমোদন দেয়া হয়।

বাস্তবায়নে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। কিলোমিটার প্রতি ৬৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয় হবে।

প্রকল্পটির জন্য চীন ১০ হাজার ৬৫৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণ দেবে। বাস্তবায়ন করবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিমূল্য ১৪ হাজার ৪৯০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও। জুলাইয়ে এক চিঠিতে চলমান রেললাইন মিটার গেজ হতে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের যৌক্তিকতা জানতে চাওয়া হয়।

১১টি প্রশ্ন করা হয়েছে এতে। এর মধ্যে রয়েছে- বর্তমান মিটার গেজের পাশাপাশি আরেকটি ডুয়েল গেজ লাইন স্থাপনে সমস্যা কোথায়; জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন প্রকল্পের চেয়ে এ প্রকল্পের খরচ দ্বিগুণ হওয়ার কারণ কী; বিদ্যমান মিটার গেজ লাইনটি কবে স্থাপন হয়েছে ও লাইফটাইম কত; ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইন করতে কত সময় লাগবে এবং ব্রডগেজ ডাবল লাইন করতে কত সময়ের প্রয়োজন; চীন, ভারত ও বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনে গড়ে খরচ কত; কুলাউড়া-শাহবাজপুর লাইনের প্রতি কিলোমিটারে খরচ কত; একই এলাকায় লাইন তৈরি করা হলেও আখাউড়া-সিলেট লাইন নির্মাণে খরচ এত বেশি কেন; সিলেট এলাকা পাহাড়ি হওয়ায় সেখানে মাটির কাজে খরচ কম হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে সেটি অনেক বেশি হচ্ছে কেন?

রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসব প্রশ্নের ‘উত্তর’ দিয়েছে। তবে এখনও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সিদ্ধান্ত আসেনি বলে বুধবার রেলপথ সচিব মো. সেলিম রেজা যুগান্তরকে জানিয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা সেল সূত্র জানায়, কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইন বাস্তবায়নে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

অথচ একই স্থানে আখাউড়া-সিলেট প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হবে ৬৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা! কুলাউড়া-শাহবাজপুর প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বরে চুক্তি করে রেলওয়ে।

ভারতের ঋণে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে দেশটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কালিন্দী রেল। ৫২ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার এ রেলপথ ডুয়েল গেজে রূপান্তরের চুক্তিমূল্য ৫৪৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

রেলওয়ে অবকাঠামো বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত বিদ্যমান মিটার গেজ রেললাইন ডুয়েল গেজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ পথে ডাবল লাইনও তৈরি করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ হয়ে গেছে।

১৮৪ দশমিক ৬০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ এ প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৩ হাজার ৪৯৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ১৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

আর আখাউড়া-সিলেট সিঙ্গেল লাইন নির্মাণেই ব্যয় এর সাড়ে তিনগুণ। জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুর রেলপথেও ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

চীনের ঋণে জিটুজি ভিত্তিতে ১৬৬ কিলোমিটার পথের এ প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৪ হাজার ৫৮৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। কিলোমিটার প্রতি ব্যয় পড়বে ২৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

রেলওয়ে পরিকল্পনা দফতরের এক কর্মকর্তা জানান, আখাউড়া-সিলেট রেলপথে বর্তমান লাইন দিয়ে আরও অন্তত ৫০ বছর ট্রেন চালানো যাবে। তাই এর পাশে ব্রডগেজ লাইন হওয়া দরকার, শুধু ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইন নয়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইনে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রডগেজ লাইন তৈরির প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ফলে আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইন হলে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রায় পুরোটাই ব্রডগেজ হবে।

এতে একদিকে মিটার গেজ ট্রেন চলবে, অন্যদিকে ব্রডগেজ বা দ্রুতগতির ট্রেনও চালানো যাবে।

আরেক কর্মকর্তা জানান, রেলওয়ে তথা রেলপথ মন্ত্রণালয়ে এক শ্রেণির কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেয় না বা নেয়ার পক্ষে নয়।

কারণ, একই লাইনে কয়েক বছর পরপর নতুন করে প্রকল্প গ্রহণ করা হলে নানা ভাবে তারা লাভবান হন।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আখাউড়া-সিলেট মিটার গেজ প্রকল্প থেকে ডুয়েল গেজ লাইনে রূপান্তর প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর আগেই ওই পথে আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

রেলওয়ের এক সাবেক মহাপরিচালক জানান, মনে রাখতে হবে, বড় জোর ৩০ বছর মিটার গেজ ট্রেন চলবে। এরপর বিশ্বের কোথাও মিটার গেজ ইঞ্জিন-কোচের যন্ত্রাংশ পাওয়া যাবে না।

সে কারণে যে কোনো লাইন নির্মাণ প্রকল্পে ব্রডগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ জরুরি। মিটার গেজকে সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজে রূপান্তর মানেই রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় এবং দুর্নীতি-অনিয়মের পথ খুলে দেয়া। বৈদেশিক ঋণের অর্থ যথাযথ ব্যবহার না হওয়া।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, সারা পৃথিবীতে যখন ব্রডগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে, বাংলাদেশে তখন চলমান মিটারগেজ লাইন তুলে ফেলে সিঙ্গেল ডুয়েল গেজে রূপান্তর করা হচ্ছে।

এতে শুধু বড় অংকের অর্থ অপচয়ই হবে না, একইসঙ্গে তা দুর্নীতি-অনিয়মের পথ খুলে দেবে, সুদূরপ্রসারী উন্নয়নেও বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, রেলপথ নির্মাণে বিশ্বের উন্নত দেশের চেয়েও বেশি ব্যয় হয় কি করে, এ নিয়ে কোনো রিসার্চও হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ব্রডগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ হলে গতি যেমন বাড়বে, তেমনি রেলে আমূল পরিবর্তন আসবে।

রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. শাসছুজ্জামান জানান, ওই পথে ব্রডগেজ ডাবল লাইন কিংবা আলাদা করে ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণ করতে হলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন।

অন্য প্রকল্পের চেয়ে এ প্রকল্পে ব্যয় বেশি কেন তা প্রকল্পপত্রে উল্লেখ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও তা জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে রেলপথ সচিব মো. সেলিম রেজা যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।

শেয়ার করুন