হোসনি দালানে হামলায় দেশীয় গ্রেনেড!

প্রকাশিত

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : দেশে তৈরি গ্রেনেড দিয়ে হোসনি দালানে হামলা চালানো হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা জানান,  এর আগে চট্টগ্রামের জঙ্গি সংগঠন ‘হামজা বিগ্রেডের’ আস্তানা এবং সাভারে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায়ও এই একই ধরনের গ্রেনেড  ব্যবহার করা  হয়েছিল। যা ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্ধার করেছিল। পুলিশ ও র‌্যাবের কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে বিষয়টি তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, চট্টগ্রামের জঙ্গি সংগঠন ‘হামজা বিগ্রেডের’ আস্তানায় অভিযান চালিয়ে যে গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে, সেই একই গ্রেনেড হোসনি দালানের হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে। এই একই গ্রেনেড সাভারের ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় ব্যবহার করেছে হামলাকারীরা।’

টেপে মোড়ানো বোমার মতো দেখতে দুই-তিনটি বস্তু পুলিশকে উদ্ধার করতে দেখেছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।

হামলায় ব্যবহৃত বিস্ফোরক সম্পর্কে একই কথা বলেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক। তিনি বলেন, ‘হামলায় ব্যবহৃত বিস্ফোরক ‘হোম মেইড’। এগুলো দেশেই তৈরি করা হয়েছে। দারুসসালামে এএসআই হত্যায় যারা জড়িত, তাদের আস্তানায়ও অভিযান চালিয়ে এই একই ধরনের বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে।’

আইজিপি আরও বলেন, ‘এগুলো বিদেশি কোনও গ্রেনেড নয়। তবে আমাদের বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, এর একটি পিন রয়েছে। পিনটি তুলে ফেলার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই এটার বিস্ফোরণ ঘটে। এটা দেশেই তৈরি করা হয়েছে। আমাদের বিশেষজ্ঞরা উদ্ধারকৃত বিস্ফোরক পরীক্ষা করে দেখছে।’

এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘এখানে গ্রেনড হামলা চালানো হয়েছে। আমরা সব হামলাকারীকে গ্রেফতার করব। এটা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।’

হামলায় নিহত সাজ্জাদ হোসেন সাঞ্জুর ময়নাতদন্তকারী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘সাঞ্জুর পাঁজরের ভেতরে লোহার লম্বা একটি টুকরো পাওয়া গেছে। যা তার ফুসফুসকে ছিদ্র করে দিয়েছে। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এছাড়া, তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আরও সাতটি স্প্লিন্টার পাওয়া গেছে।’

হামলায় আহত হালিমা ঢামেক হাসপাতালের ২০৬ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছেন। তিনি  জানান, ‘টিউব লাইট বিস্ফোরণ হলে যেরকম শব্দ হয়, ঠিক সেভাবেই শব্দ হয়েছে। বিকট কোনও শব্দ শুনতে পাইনি। আমার কোলে ছয়মাসের শিশু সন্তান কায়েস ছিল।’ তিনি ও তার সন্তান—দুজনই গুরুতর আহত হয়েছেন। তার সঙ্গে তার স্বামীসহ মোট পাঁচজন আহত হয়েছেন।

এ পর্যন্ত  ঢামেক হাসপাতালে ৬৫ জন এবং মিডফোর্ট হাসপাতালে ৪৫ জন নাম নিবন্ধন করে চিকিৎসা নিয়েছেন। অনেকে নাম নিবন্ধন না করেও চিকিৎসা নিয়ে রাতেই চলে গেছেন। তাদের মধ্যে ঢামেক হাসপাতালে ১১ জন ভর্তি রয়েছেন। একজনকে রাখা হয়েছে আইসিউতে। তার অবস্থা সংকটাপণ্ন। তার নাম জামাল।

ঢামেক হাসপাতালের ২০১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি একরাম (২৬) বলেন, ‘আমি ফল ব্যবসায়ী। রাতে ওয়াইজ গেটের ফলের দোকান বন্ধ করে মিছিল দেখার জন্য হোসনি দালানে যাই। প্রধান ফটকের সামনে সাজানো একটি ঘোড়া দেখে সেখানেই দাঁড়াই। সেখানে সবাই ছবি তুলতেছিল।  রাত দেড়টার দিকে একটা মিছিল এসে মাজারের ভেতরে প্রবেশ করে। মিছিলটি ভেতরে যাওয়ার পরপরই পাঁচমিনিটের ভেতরে চারটি বিস্ফোরণের শব্দ হয়। সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। তবে বোমার মতো কোনও শব্দ মনে হয়নি।’

এদিকে, মাজার প্রাঙ্গণে ১৬টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। তবে যেখানে মূল হামলাটি ঘটেছে, প্রধান ফটকের পাশের সেই জায়গাটি ছিল সিসি ক্যামেরার আওতার বাইরে। এমনকি সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণের কক্ষটিও।  সিসি ক্যামেরা কক্ষের দায়িত্বে থাকা অপারেটর গালিব বলেন, ‘রাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়েছে। হোসনি দালান কর্তৃপক্ষ দশদিনের জন্য তাদের এই সিসি ক্যামেরা সার্ভিস সুবিধা নেবে। প্রতিবছরই দশদিনের জন্য তাদের চুক্তি করা হয়।’

এদিকে, আইজিপি ঢামেক হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারই ছিল। তবে হাজার-হাজার লোককে ব্যক্তি পর্যায়ে  তল্লাশি করা সম্ভব হয়নি। এটা পূর্বপরিকল্পিত ছিল। স্বাধীনতাবিরোধী চক্রই এই হামলা করেছে।’

হোসনি দালানের সুপারেন্টেড এমএম ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘এই হামলায় আমরা ভীত নই। যে বোমা হামলা ঘটানো হয়েছে, তা শুধু হোসনি দালানে করা হয়নি। পুরো ধর্মীয় সম্প্রীতির বিরুদ্ধে করা হয়েছে।’ তিনি হামলাকারীদের বিচার দাবি জানিয়েছেন প্রশাসনের কাছে।

এদিকে, পুরান ঢাকার হোসনি দালান এলাকায় তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় হামলার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলাম এ কথা বলেন।

তদন্ত কমিটির প্রধান হলেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) শেখ মারুফ হাসান। বাকি দুই সদস্য হলেন, ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মীর রেজাউল আলম ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ।

শেয়ার করুন