হাসপাতালে করোনার উপসর্গ গোপন করছেন রোগীরা!

প্রকাশিত

বিশেষ প্রতিনিধি : ঢাকা শিশু হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) এক সহকারী অধ্যাপক বেশ কিছুদিন ধরে জ্বর-সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন। ঢাকা শিশু হাসপাতালে চাকরির পাশাপাশি তিনি রাজধানীর আরও অন্তত দুই ডজন বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বিভাগের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। এ রকম শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই তিনি এসব দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। গত ৯ এপ্রিল নমুনা পরীক্ষায় তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর পরই ঢাকা শিশু হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগ লকডাউন ঘোষণা করা হয়। আইসিইউতে থাকা ১৫ জন রোগীর সবাইকে স্থানান্তর করা হয়। ওই চিকিৎসকের সংস্পর্শে থাকা অন্তত ২০ জন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে দুই নার্স ও এক স্বাস্থ্য কর্মীর শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, নমুনা সংগ্রহের সময় ওই চিকিৎসক নিজের বাসার ঠিকানা হিসেবে ঢাকা শিশু হাসপাতালের কোয়ার্টারের নাম লিখে দেন। নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ওই কোয়ার্টার লকডাউন করতে যান। কিন্তু সেখানে তারা ওই চিকিৎসককে পাননি। পরে জানা যায়, ওই চিকিৎসক ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছেও তার কোয়ার্টারে থাকার কোনো তথ্য ছিল না। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ফিরে যান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিশু হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, আক্রান্ত চিকিৎসক রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন। কিন্তু সঠিক ঠিকানা না থাকায় ওই বাসাটিকে লকডাউন করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শফি আহমেদ মুয়াজ জানান, ওই চিকিৎসকের অসুস্থতার বিষয়ে কেউই অবগত ছিলেন না। তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পরপরই আইসিইউ বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার সংস্পর্শে থাকা অন্যদেরও কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময় পরে জীবাণুমুক্ত করে ওই বিভাগটি আবার চালু করা হবে।

এভাবে চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও তাদের স্বজনের মধ্যে আক্রান্ত হওয়া বা উপসর্গের কথা গোপন করার প্রবণতা যথেষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পারিপার্শ্বিক নানা কারণে এ প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তথ্য গোপনের এই চেষ্টার কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে। করোনা উপসর্গের তথ্য লুকিয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার কারণে রোগীর সংস্পর্শে আসা চিকিৎসক, নার্সসহ সারাদেশে কয়েকশ’ স্বাস্থ্য কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি মাসে সরকারি-বেসরকারি অন্তত ১০টি হাসপাতাল ও ইউনিট লকডাউন করতে হয়েছে। কয়েকশ’ স্বাস্থ্য কর্মীকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মী কয়েকজনের সংক্রমণের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রথমে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরে ওই রোগীর সংস্পর্শে আসা চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীরাও সংক্রমিত হয়েছেন। এর ফলে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান লকডাউন ও চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীদের কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এ কারণে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার পরিধিও কমছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় সারাদেশে চিকিৎসকসহ আরও ৩৬ স্বাস্থ্য কর্মীর আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে করোনা প্রতিরোধ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিদের তথ্য লুকানোর বিষয়টি দুঃখজনক। তথ্য লুকিয়ে কেউ জনসমাগমপূর্ণ স্থানে ঘোরাঘুরি করলে কিংবা মানুষের সংস্পর্শে গেলে রোগটি অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়বে। এতে নিজের পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশীসহ সবাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। সুতরাং তথ্য লুকালে বিপদ আরও বাড়বে। আক্রান্ত হলে প্রথম কাজই হবে নিজেকে অন্যদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। অর্থাৎ আইসোলেশনে চলে যেতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে, যাতে তারা অন্য কারও সংস্পর্শে যেতে না পারেন। এতে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

ডা. আব্দুল্লাহ আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। কারণ রোগীর সংস্পর্শে থেকে তাদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে করোনার উপসর্গ থাকার পরও তা লুকিয়ে কেউ চিকিৎসা নিতে গেলে স্বাস্থ্য কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। এভাবে স্বাস্থ্য কর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসা দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সুতরাং তথ্য লুকানো কোনোভাবেই ঠিক হবে না।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ছুটি ঘোষণার পর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে হাজার হাজার মানুষ গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে অধিকাংশ সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর সরকার এ দুটি এলাকার সঙ্গে দেশের সব জায়গার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এর পরও শত শত মানুষ এ দুই অঞ্চল থেকে পালিয়ে গ্রামে ফিরছেন। গ্রামে যাওয়ার পর ইতোমধ্যে কয়েকজনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও অনেকে তথ্য লুকাচ্ছেন। এতে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এ বিষয়ে বলেন, শুরু থেকেই আমরা তথ্য গোপন না করার বিষয়ে বলে আসছি। অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সঠিক তথ্য দেন না। এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। পরে দেখা গেছে, ওই রোগী করোনায় আক্রান্ত। এতে বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ইউনিট লকডাউন করা হয়েছে। চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন। সুতরাং সবার প্রতি আহ্বান- কেউ তথ্য লুকাবেন না। সঠিক তথ্য দিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিন। নমুনা পরীক্ষা করান।

লকডাউনে যেসব হাসপাতাল ও ইউনিট :গত ৮ এপ্রিল পেটে ব্যথার উপসর্গ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি হন মুন্সীগঞ্জের এক বাসিন্দা। ওই রোগীকে নিয়ে স্বজনরা স্থানীয় ও ঢাকার আরও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে ঘোরার পর তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করেন। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রোগীর করোনা শনাক্ত হয়। এরপর তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়। কিন্তু পথেই রোগীর মৃত্যু হয়। এরপর স্বজনরা তাকে মুন্সীগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করেন। সেখানে জানাজায় কয়েকশ’ মানুষ অংশ নেন। পরে পুলিশ ওই মৃত ব্যক্তির বাড়ি খুঁজে বের করে গ্রামটি লকডাউন করে দেয়।

ঢামেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের যে ইউনিটে ওই রোগী ভর্তি ছিলেন, তার প্রধান ডা. নাজমুল হক জানান, আক্রান্ত রোগী পেটে ব্যথার অভিযোগ করেছিলেন। তার সঙ্গে যারা ছিলেন, তারা জানান- রোগী ছয় দিন ধরে ঘুমোতে পারছেন না। তলপেটের এক্সরেতে বুকেরও কিছুটা অংশ ছিল। সেটি দেখে রোগীর করোনার উপসর্গ থাকার বিষয়ে সন্দেহ হয়। নমুনা সংগ্রহ করতে গেলে রোগীর স্বজনরা জানান, তারা আগেই নমুনা দিয়েছেন। করোনা চিকিৎসায় নির্ধারিত হাসপাতালে পাঠালে পথেই ওই ব্যক্তি মারা যান। পরীক্ষায় তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর পরই ঢামেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ওই ইউনিটটি লকডাউন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্পর্শে থাকা চিকিৎসকসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে গত ১৮ মার্চ করোনা আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুর পর রাজধানীর ডেল্‌টা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল লকডাউন ঘোষণা করা হয়। মিরপুরের টোলারবাগের ওই রোগীর জ্বর হওয়ার পর তাকে ডেল্‌টা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। নমুনা পরীক্ষার পর তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। তার সংস্পর্শে থাকা ওই হাসপাতালের দুই চিকিৎসক আক্রান্ত হন। এরপর প্রায় অর্ধশত স্বাস্থ্য কর্মীকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। আইসিইউসহ হাসপাতালের কয়েকটি বিভাগ লকডাউন করে দেওয়া হয়।

রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও তথ্য গোপন করে এক রোগী চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর ওই হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগ লকডাউন করার পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। গত ১৪ এপ্রিল রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে একই ঘটনা ঘটে। এক নারী রোগীর করোনা পরীক্ষার ফল পজিটিভ হয়। পরে ওই ইউনিট লকডাউন করে স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। বোয়ালখালীর এক বাসিন্দা চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে সিসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় হাসপাতালের সিসিইউ বিভাগটি লকডাউন করা হয়। গত বুধবার শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক স্বাস্থ্যকর্মীসহ তিনজনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি লকডাউন করা হয়।

একইভাবে রাজধানীর ইমপাল্‌স ও বারাকা কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকসহ কয়েকজন স্বাস্থ্য কর্মী আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠান দুটি লকডাউন করে সবাইকে কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে তথ্য গোপন করে ভর্তি হন গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকার এক রোগী। তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডটি লকডাউন করে স্বাস্থ্য কর্মীদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, অসচেতনতা আর তথ্য লুকানোর প্রবণতার কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। আর তৃতীয় কারণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসম্পন্ন সুরক্ষাসামগ্রী না দেওয়া। মানসম্পন্ন পিপিইসহ সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করলে চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীরা আক্রান্ত হতেন না। প্রতিদিনই তো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে লাখ লাখ পিপিই বিতরণের খবর জানানো হয়। সেগুলোর গুণগত মান কেমন, সে সম্পর্কে তো কিছুই বলা হচ্ছে না।

ডা. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, যতটুকু খবর পেয়েছি, সারাদেশে যেসব পিপিই পাঠানো হয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এসব নিম্নমানের পিপিই কেন কেনা হলো? এসব পিপিই তো স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার পরিবর্তে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে। দ্রুত মানসম্পন্ন পিপিই সরবরাহ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তখন রোগীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে চিকিৎসাকর্মী কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

শেয়ার করুন