সন্তান সম্ভাবা দম্পতির করোনা জয়ের গল্প: পর্ব-১

প্রকাশিত

রেজাউল করিম : সন্তান সম্ভাবা প্রতিটি নারী-ই স্বপ্ন দেখে তার বাবু যেন সুস্থভাবে ধরাধামে আসে। নারী জীবন সার্থক করে সংসারকে আনন্দে ভরে তোলে। গর্ভধারণের প্রথম থেকেই মনের গহিনে বুনতে থাকে এমন শত আয়োজন ও ভালো লাগার বিষয়। কিন্তু অকস্যাৎ যদি কোন ঘটনা প্রথম সন্তান সম্ভাবা সে নারীর স্বপ্ন ফিঁকে করে দেয়; তবে সে তো আর স্বাভাবিক চিত্তের থাকতে পারে না। যদি কোন মরণঘাতি রোগ স্বামী ও অনাগত সন্তানসহ তার জীবন কেড়ে নেওয়ার উপক্রম করে। তবে সে তো আর জ্ঞান শক্তি ধরে রাখতে পারে না।

হ্যা এমনি এক নিদারুণ ঘটনা ঘটেছিল আমার জীবনে। সেদিন স্ত্রী আমার দু’পা ধরে অঝোরে কেঁদেছিল। তার কান্নায় যেন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আসছিল। আমার সব ইন্দ্রিয় যেন অকেজো হয়ে যাচ্ছিল। শান্তনা দেওয়ার ভাসা সেদিন আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। কেননা স্ত্রী সেদিন বুক ফাটিয়ে কাঁদছিল আর শুধু একটি প্রশ্নই করেছিল- ‘আমার বাবু (সন্তান) কী আর দুনিয়ায় আসতে পারবে না?’ আমরা কী এমন অপরাধ করেছি আল্লাহর কাছে? যে তিনি আমাদের তিনজনের প্রাণ কেড়ে নিবেন। ও আল্লাহ তুমি আমাদের অনাগত নিষ্পাপ বাবুর জন্য হলেও আমার ও আমার স্বামীর (রিজাউল করিম) জীবন সুস্থ করে দাও।

হ্যা ঘটনার দিনটি ছিল ১১ মে সোমবার। প্রতিদিনের মতো এদিনও বাসায় বসে অফিসের কাজ করছিলাম। তবে এদিন প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর বিশ্রাম নিয়ে কাজ করছিলাম। কারণ গায়ে জ্বর আর ব্যাথা ক্রমশই বাড়ছিল। যদিও শরীরের এ জ্বর আরো তিনদিন আগে থেকেই ছিল। প্রথম তিনদিন এটিকে পাত্তাই দেয়নি। সিজেনাল জ্বর হিসেবেই দেখছিলাম। তাই সামান্য সেই জ্বর-ব্যাথা সারতে ভরসা করেছিলাম শুধু নাপার উপরে।
সহধর্মীনি ফারহানা করিম কয়েকবার করোনা ভাইরাসের প্রসঙ্গ উঠালেও স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলাম। আর নিজে তো একবারও করোনার কথা কল্পনাতেও আনি নাই। কিন্তু স্ত্রীর জোরাজুরি আর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি’র করোনা টেস্টের বিশেষ সুযোগ থাকায় আগের দিনে ১০ মে স্যাম্পল দিয়ে আসছিলাম। স্যাম্পল দিয়ে আসলেও আমি কিন্তু ছিলাম স্বাভাবিক। কোন করোনাতঙ্ক বা টেস্টের রেজাল্ট পাওয়ার উদ্বিগ্নতা মোটেও ছিল না।

তবে স্যাম্পল দেওয়ার পরদিন ১১ মে বন্ধু আবু আলী ফোনে রেজাল্ট জানতে চেয়েছিল। আমি বললাম রেজাল্ট আসেনি। ও বললো, আরে করোনা হলে এতোক্ষণে ক্যালাই (অসুস্থ হয়ে) পড়তে। আমি বললাম আমিও তাই মনে করছি বন্ধু। আসলে এটি আবহাওয়ার কারণে হয়েছে। কথা সেখানেই শেষ।

শরীরটা ক্লান্ত ভেবে আমি শুয়ে আছি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভাত খেতে যাব। এমন সময় ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের নেতা রাজি হাসানের ফোন। সে জানায়, ভাই আপনার টেস্ট রেজাল্ট মেইলে পাঠানো হয়েছে। দেখেন তো কী রেজাল্ট আসছে। আমি খাওয়া বাদ দিয়ে মুহূর্তেই মেইল খুলি। মেইল খোলার পর করোনা টেস্টের রিপোর্টের দিকে আমার আগেই স্ত্রীর চোখ পড়ে। আমার আগেই সন্তান সম্ভাবা চার মাসের অন্তসত্ত্বা সেই নারী বুঝে ফেলে যে তার স্বামীর করোনা পজিটিভ। এক সঙ্গে বসবাস করায় তার শরীরেও এতোদিনে করোনা ভাইরাস ভর করেছে নিশ্চিত। যা তার ও তার স্বামীর প্রাণ কেড়ে নিবে। দুনিয়ায় আসতে দিবে না তাদের অনাগত সন্তানকে।

ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে থাকে আর শেষ বারের মতো স্বামীকে স্পর্শ করতে থাকে। নিজের পেটে হাত দিয়ে বলতে থাকে বাবুটা আমার, অনেক আশা, অনেক স্বপ্ন ও আয়োজন ছিল তোমাকে ঘিরে। কিন্তু বিধাতা আমাদের উপর নাখোশ। তুমি পৃথিবীর আলো আর দেখতে পারবে না।

ঘরের চার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দেয়। বলতে থাকে কত কষ্ট করে গুছিয়েছি এ সংসার। আমার স্বামীর কোন বদ অভ্যাস নেই। দুজনের চিন্তাই কত মিল। সবাই আমাদের আদর্শ ও সুখী দম্পতি বলে। আজ আমার সুখের সংসার। আল্লাহ আমার সে সুখ সইলো না।

স্ত্রী কাঁদে আর মৃত্যুর আগের মতো শেষ নসিয়ত করে মরে গেলে তাকে যেন শ্বশুর বাড়ীর সুন্দর একটি কবর স্থানে দাফন করা হয়। যার পাশাপাশি তার স্বামীরও দাফন হয়। স্ত্রীর আতঙ্ক, অস্বাভাবিক কথা ও ব্যবহার থামাতে আমি কখনও নিজেকে সামলে ধমক দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পরক্ষণেই দেখেছি তার চোখ দুটো কাঁদতে কাঁদতে ভয়ঙ্কর লাল ও বড় হয়ে গেছে। ঠোট দুটো আর যেন তার নড়াতে পারছে। অবস্থা বেগতিক দেখে নিজে থেকে চুপসে গেছি। ঠান্ডা মাথায় তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি আর আল্লাহর কাছে সর্বান্ত করণে ক্ষমা চেয়েছি। সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়েছি।

স্ত্রীর কান্নার সঙ্গে আমিও সেদিন গুমরে গুমরে কেঁদেছি। কিন্তু স্ত্রীকে বুঝতে দেয়নি। সে আরো কান্নায় ভেঙ্গে পড়বে বলে। এমনভাবে কাঁদতে কাঁদতেই কোন কিছু খাওয়া ছাড়াই চলে যায় একটি দিন। শুধু মনে হচ্ছিল মরতে তো হবেই- কী হবে খেয়ে। আর ঘুমের কথা ভুলে ছিলাম পুরো দুটো দিন। দুইদিন পর বুঝতে পারি চোখে ঘুম জমেছে। ঘুমের দরকার। কিছু খাওয়াও দরকার। না খেলে তো নিজেদের থেকেই মরে যাব।
এভাবে দুইদিন পর বন্ধু ও শুভাকাঙ্খীদের যোগানো সাহসে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকলাম। ওষুধ চলতে থাকলো। নিজেদের বেড আলাদা করে নিলাম। রাতে ঘুমুতে যেতাম ঠিকই। ঘুম তখনও ঠিক মতো হতো না। সারাক্ষণ মনের ভিতর শুধু ভয় কাজ করতো। এই বুঝি ঘুমের ঘোরে দম আটকে মারা গেলাম। ওই বুঝি অন্য বেডে থাকা আমার স্ত্রীর ফুঁসফুসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। ঘুমের কারণে আমি তা বুঝতে পারলাম না। রাত হলে দুজনেরই এমন আতঙ্ক বেড়ে যেত। তাই একটু পরপর মাথাটা উচু করে দূর থেকে একজন অন্যজনকে দেখে নিতাম। শান্তনা পেতাম নারে দুজনকেই আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন।

স্ত্রী গর্ভবতী হওয়ায় তার সমস্যাটা ছিল বেশি প্রকট। এমনও রাত গেছে ১০-১২ বার পাতলা পায়খানা সঙ্গে বমি তো আছেই। বমির কারণে কত বিছানা ও পরণের কাপড় যে নষ্ট হয়েছে। তার কোন ইয়ত্তা নেই।

এভাবে প্রায় একমাস চলেছে। দুজনকে দূর থেকে শুধু দেখেছি। গায়ে জ্বর-ব্যাথা থাকলেও পরস্পরকে স্পর্ষ করতে পারি নাই। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে নির্বাক দর্শকের মতো তাকিয়ে থেকেছি। কোন কথা বলার শক্তিও ছিল না দুজনের।

দীর্ঘ সময় পর গত ৩ জুনে করোনার দ্বিতীয় টেস্টে দুজনেরেই রেজাল্ট আসলো নেগেটিভ। এখন অনেকটা সুস্থ বোধ করছি। যদিও এখনও শরীর অনেক দুর্বল। শরীরের গিট ও শীরাগুলোতে ব্যাথা। চোখে ব্যাথা। উঠে দাঁড়ালে মাথা ঘুরে। অসহ্য যন্ত্রণা আর মৃত্যুর দুয়ার থেকে জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অবনত মস্তকে সবটুকু কৃতজ্ঞতা হে আল্লাহ তোমার প্রতি রইলো।

এছাড়া কৃতজ্ঞতা জানাই মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ীর প্রতি যাদের বুকফাটা কান্না ও দোয়ায় আল্লাহ এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিলেন। ধন্যবাদ জানায়, বড় ভাই (ভাইরা ভাই) Sumon Sumon , ছোট ভাই Md Habib ও রুমা আপাকে। যারা সার্বক্ষণিক দেখা শোনা করেছেন, প্রয়োজনীয় সবকিছুর যোগান দিয়েছেন।

ধন্যবাদ জানায় বড় ভাই (বস) Saiful Islam Dilal কে। যিনি সার্বক্ষণিক খোঁজ নিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন ও সাহস যুগিয়েছেন। আরো ধন্যবাদ জানায় আমার প্রিয় কর্মস্থল একুশে পরিবারের সিনিয়র ব্যক্তিত্ব রঞ্জন দাদা, সবুজ ভাই, মুশফিকা নাজনিন আপু, সাইদুল ইসলাম ভাই, কোম্পানি সেক্রেটারি @Atiqur Rahman , এইচ আর এডমিন প্রধান নাসিম, রাইসা আপু, শাম্মি আপু, আল-আমীন ও আওয়াল চৌধুরী ভাইকে।

ধন্যবাদ জানাই প্রাণের সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রেসিডেন্ট রফিকুল ইসলাম আজাদ, সেক্রেটারী রিয়াজ চৌধুরী, কল্যাণ সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ, বন্ধু আবু আলী, হাসান সোহেল, রাজি হাসান, আব্দুল্লাহ আল কাফীসহ সবাইকে।

ধন্যবাদ জানাই বিজেসি ও ড. তুসারকে। ধন্যবাদ জানাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টেলিমেডিসিন সেবাই নিয়োজিত ডাকতারদের।

এছাড়া ধন্যবাদ জানাই আমার যশোরের বড় ভাই ডিআরইউ সাবেক সেক্রেটারি মুরসালীন নোমানী, ব্যাংক কর্মর্তা মনিরুজ্জামান টিটু ভাইসহ সব আপনজন, বন্ধু, শুভাকাঙ্খী ও পরিচিতজনকে। যারা বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্নভাবে আমার পাশে ছিলেন। সুস্থতার জন্য প্রাণ খুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। আজ এ পর্যন্তই। সবাই সাবধানে থাকবেন। ভালো থাকবেন। করোনার ভয়ালো ছোবল যেন আর কারো উপর না পড়ে। আমাদের মতো কেউ যে এমন আতঙ্কগ্রস্ত না হয়। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, সচেতন ও সতর্ক থাকুন। আল্লাহ হাফেজ।

বি: দ্র: কিভাবে সুস্থ হয়ে উঠলাম? কেমন কাটছিল অসুস্থ সেই দিনগুলো এমন বিষয়গুলো পরবর্তী লেখায় ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

লেখক : করোনাজয়ী সাংবাদিক।

শেয়ার করুন