লকডাউন লাইফ

প্রকাশিত

রায়হানা হানী : করোনার জন্য লকডাউন দেশ, নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী মহামারিতে রূপ নিয়েছে কোভিড-১৯। এই অবস্থায় ‘লকডাউন’ শব্দটি বেশ আলোচনায় রয়েছে। ব্যাস্ত শহর ইস্তানবুল, পর্যটকদের জন্য একটি স্বপ্নের গন্তব্য কিন্তু এই ব্যাস্ত শহর এখন যেন এক ভুতুড়ে নগর। ব্যস্ত এই শহরের প্রাণবন্ত জীবনে ফিরে আশার অপেক্ষায় এখন সবাই।

তরঙ্গের অস্তিত্ব, শক্তি, ক্ষমতা সবই সমুদ্রের সঙ্গে জড়িত, সমুদ্রের বাইরে তরঙ্গ কিছুই না। তেমনি মানুষও সৃষ্টিগতভাবে সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত। মানুষ সামাজিক জীব, সমাজের বাইরে তার অস্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। তাঁর পক্ষে বিচ্ছিন্ন থাকা অসম্ভব। কিন্তু এখন করোনার এই মহাবিপদের সময় আমরা সবাই লকডাউনে । ঘরবন্দি সঙ্গিহীন সময় শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন যাবতই, ইতিমধ্যে অনেকেই হাঁপিয়ে উঠেছেন।

এরদোয়ান জাতির উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, প্রাদুর্ভাবের প্রতিটি ঘটনার জন্য তুরস্ক প্রস্তুত। তুর্কিদের ধৈর্য ও সমর্থন প্রদর্শনের আহ্বান জানান। উজ্জ্বল দিনগুলি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, যতক্ষণ আমরা সতর্কতা অবলম্বন করি এবং সাবধান থাকি। প্রতিটি নাগরিকের জীবন আমাদের জন্য মূল্যবান। এজন্য আমরা বলি ‘ঘরে থাকো তুরস্ক’(Evde Kal Türkey)।

তুরস্কে জনসাধারণের জায়গাগুলি বন্ধ করা, কারফিউ দেওয়ার পাশাপাশি মসজিদ, স্কুল, ক্যাফে এবং বার বন্ধ করে দেওয়া, এবং খেলাধুলার ম্যাচ ও ফ্লাইট স্থগিত করা সহ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

তুরস্কে বাড়ানো হয়েছে লকডাউনের সময়। ২০ এপ্রিল (সোমবার) লকডাউনের সময় শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তা আগামী ৩ মে পর্যন্ত বলবৎ থাকবে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। তুরস্কের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনাভাইরাসে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩, ৯৭৭ জনকে নতুনভাবে সনাক্ত করা হয়েছে এবং ১২৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। আগের দিনে এ সংখ্যা ছিল ৩,৭৮৩ জন। এ পর্যন্ত সর্ব মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছরিয়েছে ৮৬,৩০৬ জন আর মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,০১৭ জন। সব মিলিয়ে প্রায় ১১,৯৭৬ জন সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছেন।

ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সরকার। নাগরিকদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা, খাদ্যসামগ্রীর নিশ্চয়তার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ইস্তানবুল ইউনিভার্সিটি সহ অন্যান্য আরোও ভার্সিটি গুলো বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা যেমন বিদেশী ছাত্র ছাত্রীদের কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোসহ ডরমিটরিতে আনলিমিটেড হাইস্পিড ইন্টারনেটের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ছাত্র ছাত্রীদের সাথে ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল অফিস থেকে অনলাইনে যোগাযোগ করার চেষ্টায় নিয়জিত আছে।

২০ বছরের নিচে ও ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে বয়সীদের ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাকি নাগরিকরা কাজ করতে পারবে বলে জানিয়েছে।

বিপদের এই সময় কত দীর্ঘ হবে আমাদের অজানা। যারা হোম অফিস করছেন বা অনলাইনে ক্লাস করছেন সকলের জন্য এ এক দুঃসময়। এই সময়ে একাকীত্ব, মানসিক চাপ আর অবসাদ ভর করা অকল্পনীয় নয়। অবসাদ যে কোন মানুষকে জীবনের যে কোন সময়ই আক্রমণ করতে পারে। তবে এই কঠিন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কী করে ভাল থাকবেন তাই নিয়ে বিবিসি কিছু পরামর্শ দিয়েছে।

১। কমপক্ষে সাত ঘণ্টা ঘুমান। ঘুম কম হলে শরীরে্র স্ট্রেস তৈরি করে।

২। শাক সবজি, চিকেন স্যুপ, বোন ব্রথ এগুলো ভিটামিনের মূল উৎস। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

৩। ভিটামিন সি গ্রহণ করুন। ভাইরাস এর হাত হতে নিজেকে বাঁচাতে এই ভিটামিন ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

৪। ভিটামিন ডি হল জরুরী একটি জিনিষ যা গবেষণায় প্রমাণিত । শীতপ্রধান দেশে অধিকাংশই এই ভিটামিনের অভাবে ভুগে থাকে।

৫। শরীরচর্চা করুন। এখন অঢেল সময় আর শরীরচর্চার ভূমিকার কথা নিশ্চয়ই নতুন করে বলার কিছু নেই ।

ইন্টারনেট থেকে পাওয়া এই টিপস গুলোর বাহিরেও ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে আর যা যা করণীয় সবাই তা জানেন।

সবকিছু ভাগ্যের উপর ছেড়ে না দিয়ে যতক্ষণ নিশ্বাস আছে ততক্ষণ যেন আমরা নিজেদের এবং আমাদের চারপাশের সবাইকে ভাল রাখতে পারি সেই চেষ্টাই পৃথিবীকে এই মহামারী থেকে উদ্ধার করতে পারবে।

যারা আক্রান্ত হয়েছে বা ভাইরাস বহন করছে তাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। তা ছাড়া ডাক্তাররা পরামর্শ দিয়েছেন বার বার হাত ধোয়ার, হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করার, ঘরের বাহিরে গেলে মাস্ক ব্যাবহার করার।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাব্রিয়েল লিউং বলছেন, হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, বার বার হাত ধুতে হবে। হাত দিয়ে নাক মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাহিরে গেলে মাস্ক পরতে হবে। আপনি যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন তাহলে মাস্ক পরুন, আর নিজে অসুস্থ না হলেও, অন্যের সংস্পর্শ এড়াতে মাস্ক পরুন।

কোভিড ১৯ আসার আগে কী কেউ ভেবেছিল সবাইকে ঘরে বসে থাকতে হবে?

এদিকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস মহামারীতে আক্রান্তদের এক-চতুর্থাংশই সুস্থ হয়ে পরিবারে ফিরে গেছেন। মারা গেছেন শনাক্তের মাত্র ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তবে বিশ্বজুড়ে এখনও শনাক্ত বিহীন রয়ে গেছে লাখ লাখ রোগী। সংক্রমণ রোধের জন্য সকল শক্তি বিনিয়োগ করে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সকল দেশগুলো।

পরিশেষে বলতে পারি যে, ঘরে থাকাই হোক আমাদের ধর্ম আর দেশ প্রেমই হোক আমাদের মানবতার দর্শন। কারণ এই মূলমন্ত্রই আমাদের সমাজকে বাঁচাবে, আর সমাজ বাঁচলেই আমরা বাঁচব। সকলের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবন কামনা করি। সুস্থ থাকুন, ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন।

লেখক : বাংলাদেশী শিক্ষার্থী, ইস্তানবুল ইউনিভার্সিটি, তুরস্ক।

শেয়ার করুন