যে চিকিৎসায় সন্তান সম্ভাবা দম্পতির করোনা জয়-২

প্রকাশিত

রেজাউল করিম : বিশ্বব্যাপী করোনার ভয়াল ছোবলে প্রতিদিনই লম্বা হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। সর্বত্র চলছে বাঁচা-মরার লড়াই। সেটা ত্বরুণ, যুবক ও বৃদ্ধ যে বয়সেরই হোক। তাই সৃষ্টি কর্তার দেওয়া জীবন ও সে জীবনের সুস্থতা যে কত বড় নেয়ামত, তা এখন আমরা বুঝতে পারছি পরতে পরতে।

কেননা মরণঘাতি করোনায় আক্রান্ত হয়ে এরই মধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন কেউ কেউ। অনেকে আবার করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে আল্লাহর দয়া আর আপনজনদের দোয়ায় বেঁচেও যাচ্ছেন।

ফলে করোনাক্রান্ত হয়েও বেঁচে যাওয়াদের গল্প এখন অন্যদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছেন কি চিকিৎসা ও পরামর্শ নিয়ে ঠিক কিভাবে আমরা সুস্থ হয়ে উঠলাম। গত পর্বে ‘সন্তান সম্ভাবা দম্পতির করোনা জয়-১’ শিরোনামে লিখেছিলাম করোনাক্রান্তের খবরে আমরা কিভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলাম বা অসহায় বোধ করছিলাম। আজ বলার চেষ্টা করবো ঠিক কি চিকিৎসা বা পরামর্শে আমরা সুস্থ হয়ে উঠলাম সে বিষয়ে।

আমরা (আমি ও আমার সন্তান সম্ভাবা স্ত্রী) যেসব উপায়ে করোনাকে জয় করে সুস্থ হয়ে উঠলাম। সে চিকিৎসা বা নিয়মগুলোকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। ১. ডাক্তারী চিকিৎসা ও পরামর্শ ২. দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় বিশেষ কিছু খাদ্য ও ৩. জীবন-যাপনে কিছু নিয়ম।

১. ডাক্তারী চিকিৎসা ও পরামর্শ: করোনা পজিটিভি জানার পর সর্বপ্রথম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টেলিমেডিসিন সেবা ৩৩৩ (ট্রিপোল থ্রি) তে ফোন দিয়েছিলাম। যেখানে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়ার জন্য ডাক্তাররা প্রস্তুত রয়েছেন। ফোন দেওয়ার পর আমার সর্দি, জ্বর আছে কীনা? কাশি আছে কীনা? করোনাক্রান্ত কারো কাছে গিয়েছিলাম কীনা? বয়স কত? এ ধরণের কয়েকটি প্রশ্ন করা হয়। এরপর কলটি রেকর্ড করা হচ্ছে জানিয়ে একজন ডাক্তার আমার রোগের সব লক্ষ্যন শুনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। এভাবে আমি দীর্ঘ ১২ দিন পর্যন্ত যখনই প্রয়োজন মনে করেছি স্বাস্থ্য বাতায়নের ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছি। ডাক্তার ওষুধের পরামর্শ মোবাইলে এসএমএস এর মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ডাক্তারের দেওয়া পরামর্শগুলো হলো-
1. Tab zimax 500mg=1+0+0 for 7 days
2. Tab.Monas 10mg=0+0+1 for 15days,
3. Tab.Napa extend=1+1+1 after meal for 7days,
4. Tab.Fexo 120mg=0+0+1 for 10 days
5. Tab.Sergel 20mg=1+0+1 30min before meal
6. নাক বন্ধ হয়ে আসলে বা দম নিতে কষ্ট হলে নাসা ড্রপ এন্টোজোল ব্যবহার করেছি।

Advice: self isolation with medication if any emergency, go for covid dedicated hospital for further management.
এই ঔষধগুলো আমাদের দুজনের জন্যই সমানভাবে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। এর সাথে স্যালাইনের পানিও খাওয়ার পরামর্শ ছিল। এছাড়া ১২ দিন পর জিহ্বায় ঘা (ফাঙ্গাস) হয়েছিল। যা দূর করার জন্য ভাইয়োডিন (লিকুইড জাতীয় ফাইল) হাল্কা গরম পানিতে মিশিয়ে গড়গড়া (গারগোল) পরামর্শ ছিল। যা এখনও করছি।

তবে স্ত্রী গর্ভবতী হওয়ায় তার জন্য আরো ৩টি ঔষধ বেশি দেওয়া হয়েছিল। শুধু স্ত্রীর জন্য দেওয়া সে ঔষধ ৩টি হলো-
1. tab.xinc(20mg)=1+0+1 for 15 days
2. tab.levostar(2mg)=1+1+1 for 07 days
3. tab.Emistat(8mg)=1+0+1 for 07 days
Advice: Take vitamin C containing natural fruits.

ডাক্তারের দেওয়া এই ঔষধগুলি সঠিকভাবে সময়মতো খেয়েছি। এর পরেও হঠাৎ কোন বিষয়ে বিশেষ কোন পরামর্শ দরকার হলে বিজেসি’র টেলিমেডিসিন সেবাই নিয়োজিত ড. তুসার ভাইয়ের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছি। ভালোভাবে খাওয়ার নিয়মগুলো জেনে নিয়েছি। যিনি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের দেখা-শোনা করতেন, পরামর্শ দিতেন।

২. দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় বিশেষ কিছু খাদ্য: এ সময় আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় বিশেষ কিছু খাবার যোগ হয়েছিল। যেমন-পোলাও চাল দিয়ে তৈরি জাও (যতদিন ভাত ভালো লাগেনি)। সাথে দেশি ও পাকিস্তানি মুরগীর ঝোল।

মাছ: শৈল মাছ, সিং মাছ, ট্যাংরা মাছ, বোয়াল মাছ, ঈলিশ ইত্যাদি।
সবজি: লাউ, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, কলা ভর্তা, কালো জিরা ভর্তা, শর্ষে ভর্তা, রসূন ভর্তা, পটল ভাজি ও ভর্তা, লাল শাক, সবুজ শাক, ডাল, ডিম, দুধ ইত্যাদি।
ফল: মাল্টা, পেয়ারা, খেজুর, বাদাম, কিচমিচ, আনার, আম, আপেল, চিড়া, ডাবের পানি, জাম, আমলকি, কামরাঙ্গা ইত্যাদি।

প্রথম ১২ দিন কোন ধরণের কাচা (নরমাল) পানি খায়নি। খুব বেশি কাচা পানি খেতে হলে স্যালাইন মিশিয়ে খাইছিলাম। পানিতে আদা, লবঙ্গ, গোল মরিচ, দারুচিনি, কালোজিরা ইত্যাদি দিয়ে গরম করেছি। খাবার আগে সেই গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে নিয়েছি। খাওয়ার পাশাপাশি এটা গড়গড়াও (গারগোল) করেছি।

৩. জীবন-যাপনে কিছু নিয়ম: পজিটিভ আসার সঙ্গে সঙ্গে দুজনই আইসোলেশন বা আলাদা বেডে চলে গিয়েছিলাম। দুজনেরই খাবার প্লেট, বাটি, গ্লাস আলাদা করে ফেলেছিলাম। সেগুলো আলাদাভাবে ধৌত করছিলাম। দুজন থেকে দূরত্ব বজাই রেখেছিলাম ২০ দিন পর্যন্ত। ১২ দিন পর গোসল করেছিলাম। এর আগ পর্যন্ত স্যাবলন পানি দিয়ে গামছা ভিজিয়ে গা মুছে নিতাম। ১২ দিন পর ২০ দিন পর্যন্ত কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করতাম। গোসলের আগে পুরো শরীর স্যাবলন পানি দিয়ে ধৌত করতাম। ১২ দিন পর কোরআন তেলাওয়াত শোনা, বসে-শুয়ে যেভাবেই হোক নামায আদায় করা, শিক্ষামূলক অথচ বিনোদন এমন কিছু অনুষ্ঠান দেখার চেষ্টা করতাম মাঝে মধ্যে। সকাল ও বিকাল বেলকনিতে বসে বুক ফুলিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতাম কয়েকবার।

এসব কার্যপ্রণালীর ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলাম। তবে এখনও চোখ জ্বালাপোড়া, দুই হাতের কনুই ও দুই পায়ের হাটুতে ব্যাথা রয়ে গেছে। এক সঙ্গে আধা ঘণ্টার বেশি কম্পিউটারে থাকলে চোখ দুটো লাল হয়ে আসে, পাতা দুটো বুজে আসে। একটু বেশি হাটলে বা আধা ঘণ্টার বেশি কম্পিউটারে থাকলে গায়ে জ্বর ও ব্যাথা বেড়ে যায়। ডাক্তার বলেছেন, চিন্তার কারণ নেই। বিশ্রামে থাকবেন। পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খেলে ধীরে ধীরে এ সমস্যাগুলোও দূর হয়ে যাবে।

এক মাসেরও অধিক সময় জীবন-মরণ যুদ্ধের পর হে আল্লাহ তুমি আমাদের সুস্থ করেছো। সকল প্রশংসা তোমার-ই ‘হে প্রভু’। তুমি আমাদের জীবনকে বাঁচিয়ে দিয়েছো। আমাদের তুমি ক্ষমা করো। বিশ্বের সব মানুষকে তুমি রক্ষা করো। সুস্থ করে দাও তোমার অপরূপ সৃষ্ট এ পৃথীবিকে।

শেয়ার করুন