যেকোনও সময় পৌরসভা অধ্যাদেশ, প্রস্তুতি চলছে ইসিতে

প্রকাশিত

বিশেষ প্রতিনিধি : যেকোনও সময় জারি হতে পারে পৌরসভা অধ্যাদেশ। এ জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে ফাইল রাষ্ট্রপতির দফতরে পাঠানো হয়েছে। ফাইল স্বাক্ষর হলেই দ্রুত ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) অধ্যাদেশ ২০১৫’ জারি করা হবে।  এ জন্য ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দুই সপ্তাহ আগে পৌরসভা আইনটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর তা  অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত অধ্যাদেশ আকারে জারি না হওয়ায় নির্বাচনি বিধিমালা প্রণয়নসহ প্রস্তুতিমূলক কাজে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে ইসির। এরপরও কমিশন আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সংশ্লিষ্ট  মন্ত্রণালয় ও ইসি সূত্রে এ সব  তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যে পৌরসভা নির্বাচন করতে হবে। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন অনুযায়ী পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। এই হিসাবে ২৪৫টি পৌরসভার নির্বাচন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে করতে হবে। কমিশন সচিবালয়ে নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের একেবারে শেষে নির্বাচন করতে হলে অবশ্যই নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ বা তার আগে তফসিল ঘোষণা করতে হবে। কারণ, প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার দিন ও ভোট গ্রহণের দিনের মধ্যে ১৫ থেকে ২১ দিন সময় রাখতে হবে। এর আগে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা, মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাছাই, আপিল নিষ্পত্তি, প্রত্যাহার এবং সবশেষে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা তৈরির জন্য আরও দুই সপ্তাহের বেশি সময় দরকার।

এর আগে গত ১২ অক্টোবর ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে করার প্রস্তাব অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। হাতে সময় কম থাকায় মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকেই পৌরসভা আইনটি অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্ত হয়।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ব্যানারে করার সিদ্ধান্ত হওয়ায় অনেকাংশেই জাতীয় নির্বাচনের আদলে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যে কারণে নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও আচরণবিধি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনুকরণে তৈরি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে দলীয় প্রার্থীকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার কর্তৃপক্ষ কে হবে, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর ব্যয়ের সীমা কী হবে, চূড়ান্তভাবে মনোনীত কোনও প্রার্থী মারা গেলে সেখানে কিভাবে নির্বাচন হবে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের যোগ্যতা কিভাবে নির্ধারণ করা হবে, সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কারা কারা নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিতে পারবেন—ইত্যাদি বিষয়ের মীমাংসা হওয়া দরকার। কিন্তু আইনের কপি হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত এসব বিধিবিধান চূড়ান্ত করা সম্ভব নয় বলে সূত্র জানায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কোনও খবর নেই। খবর এখন স্থানীয় সরকারের কাছে। সংশোধিত স্থানীয় সরকার আইনের কপির জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। এটি হাতে পাওয়ার পর প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো শেষ করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংশোধিত আইন বা অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আইনের পর আমাদের তো বিধি করতে হবে। আর বিধি করলেই শেষ হবে না। সেটা আবারও দুই দফায় সরকারের কাছে যাবে।

নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক বলেন, আইন চূড়ান্ত হতে যত বেশি সময় লাগছে, তাদের ওপর চাপ তত বাড়ছে। কারণ, হাতে সময় খুবই কম। আইন হওয়ার পর বিধিবিধান প্রণয়ন করতে কিছুটা সময় লাগবে।

বাধ্য হয়েই কমিশন অনেকটা ধারণার ওপর নির্ভর করে নির্বাচন পরিচালনাবিধি ও আচরণবিধি প্রণয়নের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে যাচ্ছে।

অধ্যাদেশ জারির বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, অধ্যাদেশ জারির জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির দফতরে ফাইল পাঠানো হয়েছে। ফাইলে স্বাক্ষর হলেই অধ্যাদেশ জারি হবে। রাষ্ট্রপতি কাল স্বাক্ষর করলে কালই অধ্যাদেশ জারি হয়ে যাবে।

পৌরসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, অধ্যাদেশ জারির জন্য ফাইল রাষ্ট্রপতির কাছে গেছে। কমিশনকে আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে বলা আছে, যেসব নির্বাচন মেয়াদপূর্ণ হবে, আপনারা করে ফেলবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, পৌরসভা নির্বাচন করার ক্ষমতা এখন আর আমার হাতে নেই। ক্ষমতা যা আছে, তা রাষ্ট্রপতি ও নির্বাচন কমিশনের হাতে।

কী থাকছে বিধিমালায় 

পৌরসভা আইনের কপি হাতে না পেলেও নির্বাচন কমিশন ধারণার আলোকে বিধিমালার খসড়া তৈরি করে রেখেছে। আইনের কপি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বিধিমালা চূড়ান্ত করে ফেলতে পারে, তার প্রস্তুতিমূলক কাজের অংশ হিসেবে আরপিও এবং ২০১০ সালের পৌরসভা বিধিমালার বিভিন্ন ধারা-উপধারা বিশ্লেষণ করে এ খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশন সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, আইনের আগে বিধিমালার সুযোগ নেই। তবে, যেহেতু ডিসেম্বরের মধ্যে আমাদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেহেতু আইনটি হাতে পেলেই যেন অল্প সময়ের মধ্যে বিধিমালা তৈরি করতে পারি। তার জন্য কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।

কমিশন সচিবালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিধি প্রণয়নের বিষয়ে কমিশনের বৈঠকে মৌখিকভাবে কিছু কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিধিমালা সংশোধনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কার্যক্রম, প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার বিধান, প্রচার-প্রচারণা, প্রতীক বরাদ্দ, প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ, নির্বাচনি ব্যয় ও উৎসের বিবরণী, ব্যালট পেপারে পরিবর্তন, প্রার্থী বাছাই, চূড়ান্তকরণ ও ফল ঘোষণার প্রক্রিয়াসহ আরও বেশকিছু ধারায় নতুন বিধান যুক্ত হতে যাচ্ছে।

সংসদ নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে থাকেন দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বা সমমর্যাদার কোনও ব্যক্তি। কমিশন এই ক্ষমতা দলীয় প্রধান বা সাধারণ সম্পাদক কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত জেলা বা উপজেলা কমিটির কাছে দেওয়ার সুযোগ রাখবে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো শতাংশ হারে ভোটারের সই সংগ্রহের পরিবর্তে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষরের বিষয়টি চিন্তা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ১০০, ২০০ বা ৩০০ ভোটারের সই সংগ্রহের বিধান রাখা হতে পারে। বিদ্যমান পৌর আইনে কোনও প্রার্থী মারা গেলে অবশিষ্ট প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কমিশন এ ধরনের ক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনের মতো নতুন করে তফসিল ঘোষণার নিয়ম চালুর চিন্তাভাবনা চলছে।

দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও প্রচারণার ক্ষেত্রে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সিটি করপোরেশন-মেয়রসহ সরকারি সুবিধাভোগীদের প্রচারণার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করার পক্ষে আলোচনা চলছে ইসিতে। তাদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আলোকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা তৈরি করতে যাচ্ছে ইসি। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ রয়েছে। তবে, সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা সব ধরনের সুবিধা ছেড়ে শুধু নির্বাচনি এলাকার ভোটার হলে ভোট দিতে যেতে পারবেন। সংসদের আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখে দলীয় প্রধানের ছবি, দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ থাকছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে।

ইউপি নির্বাচনে হলফনামা দেওয়ার বিধান

দেশে প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হলফনামা দেওয়ার বিধান রাখার প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা। জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে এ বিধান থাকলেও ইউপিতে তা ছিল না। দলীয় ব্যানারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধান প্রবর্তনের কারণে হলফনামা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা যুক্ত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাশাপাশি টিআইএন (ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বর) যুক্ত করার বিধান রাখার চিন্তা চলছে বলে কমিশন সূত্র জানা গেছে।

শেয়ার করুন