মালয়েশিয়ায় এমআরপি নিয়ে সংকটে প্রবাসীরা

প্রকাশিত

ডেস্ক প্রতিবেদন : মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) এখনো হাতে পাননি কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। এমন পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে এমআরপি প্রদানে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস মোবাইল ক্যাম্পিংয়েরও উদ্যোগ নিয়েছিল। তাও সফল হয়নি। হাইকমিশনের হিসেব অনুযায়ী সে দেশে পাঁচ লাখ এমআরপির মধ্যে এখন পর্যন্ত আড়াই লাখের কাছাকাছি দেয়া সম্ভব হয়েছে।

এ দিকে এমআরপি হাতে না পেলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিসহ আইনি ঝামেলায় পড়ার শঙ্কাও রয়েছে প্রবাসীদের। এ নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তারা। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরতদের হাতে পাসপোর্ট পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সে দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানকল্পে প্রবাসীদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি এমএসকে শাহীন।

তিনি বলেছেন, প্রবাসীদের হাতে দ্রুত পাসপোর্ট পৌঁছে দিতে হাইকমিশন সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আবেদনের জন্য আগতদের কাউকে ফেরত না পাঠিয়ে একদিনের মধ্যেই জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট, ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি তোলার কাজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে দূতাবাসেই যাতে করে কেউ ফেরত না যায়। এক মাসের মধ্যে তা গ্রাহকের হাতে দেয়ার চেষ্টা করছে হাইকমিশন।

সকলের কাছে এমআরপি পাসপোর্ট পৌঁছে দিতে হাইকমিশন এলাকাভিত্তিক মোবাইল ইউনিট পরিচালনা শুরু করেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রথম মোবাইল ইউনিটটি জহুরবারু থেকে কার্যক্রম শুরু করে। এতে প্রতিদিন কমপক্ষে দুই হাজার এমআরপির কাজ করা যাবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জনবল ও মেশিনারিজ পেলে সক্ষমতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা চেষ্টা করবেন বলেও জানান হাইকমিশনের এ কর্মকর্তা।

"
এদিকে সরকারি হিসেবেই এখনো ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৭টি এমআরপি দেয়া বাকি। অবশ্য বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। আবার আইকাও ঘোষিত সময়ের পর যাদের হাতে লেখা পাসপোর্ট থাকবে তারা বৈধ না-কি অবৈধ বিবেচিত হবেন, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। আর যারা এমআরপি বানাতে দেশে ফিরেছেন কিন্তু ভিসা আছে হাতে লেখা পাসপোর্টে, তারাও পড়েছেন সংকটে। ভিসা বা এনডোর্স ছাড়া নতুন এমআরপি নিয়ে ছুটিতে থাকা প্রবাসীরা কীভাবে কর্মস্থলে ফিরবেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। ২৪ নভেম্বরের পর শুধু সৌদি আরবের পক্ষ থেকে সমস্যা না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অন্য দেশগুলোর পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না দেয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন প্রবাসীরা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এমআরপি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা রয়েছে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। সৌদি আরবে ১২ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশিকে এমআরপি দেয়ার টার্গেট নির্ধারণ করে সেখানে ইস্যু হয়েছে মাত্র সাড়ে ছয় লাখ। আমিরাতে আট লাখ এমআরপির বিপরীতে দেয়া হয়েছে প্রায় সাত লাখ। মালয়েশিয়ায় পাঁচ লাখ এমআরপির মধ্যে আড়াই লাখের কাছাকাছি দেয়া সম্ভব হয়েছে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোয় ১০ লাখের মধ্যে প্রায় সাত লাখ দেয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন, ৯ নভেম্বর পর্যন্ত দূতাবাসগুলো ২১ লাখ ১৫ হাজার ৯০১টি এমআরপি ইস্যু করেছে। আউটসোর্সিং কোম্পানি ইস্যু করেছে এক লাখ ৯৭ হাজার ২২২টি। এছাড়া মিশনগুলোতে প্রায় ৫৪ হাজার ৫৪০টি পাসপোর্ট বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরে মুদ্রণের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে এখনো ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৭টি এমআরপি দিতে হবে।

"
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইকাও সময় না বাড়ালে এ বিপুল সংখ্যক পাসপোর্টধারী প্রবাসীরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এদের জন্য সরকারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

জানা যায়, মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের জন্য আন্তর্জাতিক সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের (আইকাও) সঙ্গে ১৯৯৮ সালে এমআরপি চুক্তি করে বাংলাদেশ। কিন্তু এর ১২ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ২০১০ সালে শুরু হয় এমআরপি দেয়ার প্রকল্প। ২০১০ সালের ১ এপ্রিল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দেশে-বিদেশে প্রায় এক কোটি এমআরপি ইস্যু করা হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ার শঙ্কা থেকেই চলতি বছরে কানাডার মন্ট্রিলে আইকাও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নির্ধারিত সীমা ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০১৮ সালের ২৩ নভেম্বর করার আবেদন জানান।

কিন্তু আইকাও প্রেসিডেন্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এমআরপি দেয়ার সময়সীমা আর বাড়ানো হবে না। এখন আইকাওয়ের আর কিছু করার নেই। পরে আউটসোর্সিং কোম্পানি ছাড়াও বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাংলাদেশের ৬২টি মিশনে এমআরপি দেয়ার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

তবে অভিযোগ আছে, এ পরিস্থিতির পেছনে দায়ী স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। বিদেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিশনগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে, আর পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে হওয়ায় প্রায় তিন বছর ধরে দুই মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্বে ধীরগতি ছিল পাসপোর্ট বিতরণে। এতেই মূলত সমস্যার সৃস্টি হয়েছে।

শেয়ার করুন