মংচিয়ালা গুও ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক

প্রকাশিত

রেজাউল করিম মুকুল : মংচিয়ালা গুও। বৈশ্বিক কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত। এশিয়ার দুই বৃহৎ দেশের মধ্যখানে বাংলাদেশের অবস্থান, যার একটি উদীয়মান ভারত। অন্যটি হলো চিন, যা ইতিমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া চিন কর্তৃক বাংলাদেশী ৯৭ ভাগ পণ্যের শুল্কমুক্তির ঘোষণাকে খয়রাতি না বলে খাতির বললেই ভালো হতো।

বাংলাদেশের ৯৭ ভাগ পণ্য বিনা শুল্কে চিনে রফতানি করা যাবে, অর্থাৎ চিনে বাংলাদেশী পণ্যের আমদানী শুল্ক হার শুন্য। আবার চিনে আবিষ্কৃত করোনা ভ্যাকসিন সবার আগে পাবে বাংলাদেশ বিনা মূল্যে। এ রকম দুটি খবরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কি দুঃখ পাওয়া উচিত? না, চিনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে চিনের আজকের সম্পর্ক যখন এতটাই মার মার কাট কাট তখনই চিন সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ভারতীয় মিডিয়ার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দুঃখজনক। ভারতের ‘জি নিউজ’একটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের প্রতি চীনের এই শুল্কমুক্ত বাণিজ্যরীতিকে ‘খয়রাতি’হিসেবে উল্লেখ করেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ও চিনের সম্পর্ক ‘নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে বলেও হতাশা প্রকাশ করেছে সংবাদ মাধ্যমটি। ভারতকে চাপে ফেলতেই বাংলাদেশকে এমন শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ করে দিয়েছে চিন, এমন ভিত্তিহীন মন্তব্য করেছে গণমাধ্যমটি। তবে প্রকৃত সত্য হলো এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্টের আওতায় চিনে আগের থেকে ৩০৯৫টি বাংলাদেশী পণ্য শুল্কমুক্ত ছিলো, এবার নতুন করে ছাড় দেওয়ায় চিনে শুল্কহীন হল ৮২৫৬টি বাংলাদেশি পণ্য। চিন সরকার জানিয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশের আর্থিক উন্নয়নে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে শুল্ক ছাড় ছাড়াও বাংলাদেশে বিনিয়োগও বাড়িয়েছে চীন। মাসখানেক আগে কোভিড-১৯ নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আলোচনাও করেছেন।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই খুবই মজবুত ও বুনিয়াদী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা ভারতের একাত্তরের সরকারের সাহায্য ও সহায়তা এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির আন্তরিক প্রচেষ্টা এত দ্রুত সম্ভব করে তুলেছিলো। যে যাই বলুক একমাত্র প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধি একাত্তরে ভারতের সরকারে না থাকলে এ দেশটি আজও পূর্ব-পাকিস্তানই থেকে যেতো। সেই ভারতে এখন মৌলবাদী চিন্তা চেতনার উদ্ভব ঘটেছে। ভারতকে এখন হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিনত করার নীতি গ্রহন করা হোয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষ্ণগণের ধারণা ভারতের সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজকের অস্হিরতার মূলেই রয়েছে চলমান ধর্মীয় উন্মাদনা যা দেশে বিদেশে সচেতন শিক্ষিত আধুনিক মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। রং বদলায় ঋতু বদলের মতো করে। ভারতের যে গুজরাত থেকে অহিংসার ঝান্ডা উড়িয়ে জাত, পাত, অস্পৃশতা, অচ্ছুত্বতাকে পদদলিত করে সব মানুষকে একিভূত করেছিলেন মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, ভারতের সেই গুজরাত আজ শোনায় মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক দানবের গল্প।

ভারতের নাগরিকত্ব আইন এনআরসি, সিএএ ও এনপিআর সে দেশের অভ্যন্তরিন বিষয় হলেও এসব আইনের লক্ষ্য ভারতের মুসলিম, যাদের অবৈধ্য বাংলাদেশী আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৪৭ পরবর্তি সময়ে ভারতীয় মুসলিমরা আধা হিন্দু আধা মুসলিম হোয়ে দিন গুজরান করছিলেন। এবারে তাদের পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে আসা ডাউটফুল নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারীর দিল্লি হত্যাকান্ড এনাআরসির একজিকিউশন নমুনা মাত্র। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০খ্রিঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথমবারের মতো ভারত সফরের মধ্যেই এনআরসি, সিএএ এবং এনপিআর নাগরিকত্ব আইনের পক্ষে-বিপক্ষে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র হয়ে উঠে রাজধানী নয়াদিল্লি। টানা তিনদিন চার রাতে অগ্নিগর্ভ হোয়ে উঠে উত্তর-পূর্ব দিল্লি। দিনভর রাস্তায় রাস্তায় চলে পাথরবৃষ্টি, অগ্নিসংযোগ, মুসলিমদের দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট। হিংসায় মৃত্যু হয় এক পুলিশকর্মী সহ ৪২ জনের, জখমের সংখ্যা ৩৯০ এবং নিখোঁজের সংখ্যা আরো বেশী। এ যেন ২০০২খ্রিঃ ১৫ অক্টোবরের গোধরাকান্ডের ধারাবাহিকতা। ভারতীয় লোকসভায় ৩১১/৮০ ভোটে পাশ হওয়া এনআরসি এর সংশোধনী সিএএ ভারতের সাম্প্রতিক মুসলিম বিদ্বেশী মনোভাবকে উৎসাহিত করেছে, উস্কে দিয়েছে বহুমাত্রিক সহিংসতা। বিশেষ্ণগণ মনে করেন এটা পূর্ব পরিকল্পিত। কমরেড জ্যোতি বসু বলেছেন সরকারের অনিচ্ছায় দাঙ্গা হয় না, দাঙ্গা হয় সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে। মুসলিমদের ভারত থেকে বের করে দেওয়ার আইন এনআরসি, সিএএ ও এনপিআরকে বাধা দিয়েছে প্রকৃতি নিজেই। মার্চ থেকে ভারতে কোভিড-১৯ এর প্রাদূর্ভাব এনআরসি কার্যক্রমকে থামিয়ে দেয়, সরকারিভাবে বাতিল করা হয় নাই। করোনাভাইরাস শাপেবর হোয়ে ভারতীয় মুসলিমদের রক্ষা করে, এবং এরই মধ্যে লাদাখ সীমান্তে চিনের অবস্হান অনিদৃষ্টকালের জন্য ভারতীয় অভ্যন্তরিন রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। পক্ষান্তরে দেখুন ২০০৯ সাল থেকে কয়েক লক্ষ ভারতীয় নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেমন: এনজিও, গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, আইটি সংস্থায় চাকুরি করেন, উপার্জিত অর্থ হুন্ডি হস্তান্তর পদ্ধতিতে ভারতে পাঠায়। ২০১২ সালে, বাংলাদেশ ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনক্ষেত্র হিসেবে পঞ্চম দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়। সে বছর এই ভারতীয় অভিবাসীরা বাংলাদেশ থেকে ৩.৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার উপার্জন করে ভারতে পাঠিয়েছেন বলে শোনা গেছে। এই অভিবাসীদের বেশিরভাগই পর্যটন ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন, তবে বের হওয়ার কোন প্রবণতা দেখা যায় না।

১২০৬ খ্রিঃ মোঘল যাযাবরদের বিভিন্ন ট্রাইব বা গোত্র একটি কুরিলতাই বা সমাবেশে তিমুজিন নামের এক সাহসী তাবুবাসী যোদ্ধাকে তাদের প্রধান নিযুক্ত করে । সেইসাথে ঐ ব্যক্তির দুঃসাহসী নেতৃত্ব ও যুদ্ধাংদেহী মনোভাবের জন্য তাকে চেংগিস খাঁন উপাধীতে ভূষিত করে । ১১৬৭ সালে জন্ম নেয়া তিমুজিন চেংগিস খাঁন হয়ে ১২১১ খ্রিঃ সবার আগে চীনের উত্তরাংশ আক্রমন ও দখল করে নেন । ১২১৫ খ্রিঃ চেংগিস বেইজিং দখল করেন। ১২৪০ খ্রিঃ চেংগিসের ছেলে ওগোডেই খাঁন রাশিয়া, হাঙ্গেরী, পোল্যান্ড অধিকার করে নেন এবং কিয়েভ নগরী ধুলায় মিশিয়ে দেন। পরের বছর ১২৪১ খ্রিঃ ওগোডেই মারা গেলে ইউরোপ আক্রমন স্হগিত হয়ে যায় কিন্তু মোঘলরা ১২৫৮ খ্রিঃ বাগদাদ দখল করে নেয়। ১২৬০ খ্রিঃ কুবলাই খাঁন পঞ্চম মোঘল সম্রাট মনোনিত হন এবং ১২৭৯ খ্রিঃ চীনের দক্ষিন অংশ দখল করে চীনে প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত ইউয়ান ডায়ানেষ্টি। ১৩৯৭ খ্রিঃ মোঘলরা ভারত আক্রমন ও দখলের চেষ্টা করলেও চেংগিস ও তৈমুরের উত্তরসূরী বাবুরই সফল হয়েছিলেন ১৫২৬ খ্রিঃ যা ১৭০৭ খ্রিঃ পর্য়ন্ত স্হায়ী হয়েছিলো । মোঘলরা ১৩৬৮ খ্রিঃ পর্য়ন্ত চীন এবং ১৩৮০ খ্রিঃ পর্য়ন্ত রাশিয়া দখলে রাখতে পেরেছিলো মিং শাসকরা চীনের এবং মস্কোভিটরা রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে নেয়। এসময় এশিয়ার সমরখন্দে আর এক ইতিহাস বিখ্যাত মোঘল তইমুর লং মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ দেশ দখল করে একটি সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন এবং পূনরায় চীন দখলের প্রস্তুতিকালে ১৪০৫ খ্রিঃ মারা যান। চীন ও বাংলাদেশের জনগণ প্রাচীনকাল থেকেই পরস্পরের ভালো প্রতিবেশী ও বন্ধু। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন কিছু নয়, অনেক প্রাচীন। দুই হাজার বছর কিংবা তারও বেশি আগের সম্পর্ক। বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল যে পথ ইতিহাসে সেটাই সিল্ক রোড নামে প্রসিদ্ধ। পশ্চিমা সিল্ক রোডের সূচনা হয়েছিল রাজধানী সিয়ান (তৎকালীন ছাংআন) থেকে। সেই পথ সিনজিয়াং হয়ে আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে ভারত হয়ে পৌঁছেছিল বাংলাদেশে। চিনারা তখন এ দেশকে বলতো 孟加拉国 মংচিয়ালা গুও। গুও অর্থ দেশ, আর বেঙ্গল টাইগার হলো মংচিয়া। ভাষাবিদরা বলেন চিনাদের মং থেকে বং আর বং থেকেই নাকি বাংলা। হবে হয়তো। কয়েক শতাব্দী ধরে এই মংচিয়ালাই চিন ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের সেতুবন্ধ। আরও একটি সিল্ক রোডও ছিল, যার উৎপত্তি হয়েছিল দক্ষিণ চিনের কুনমিং থেকে। এটার নাম ছিলো পূর্ব সিল্ক রোড যা মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে সংযোগ স্থাপন করেছিল বাংলাদেশের সঙ্গে। এই দুটি পথ ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল, বৃদ্ধি পেয়েছিল সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান। প্রাচীনকাল থেকে চিন নৌ ও স্থলশক্তিতে অত্যন্ত বলবান দেশ হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র ইতিহাসে চিন অন্য কোনো দেশে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেনি, অন্য কোনো দেশ দখল করে নেয়নি। বরং সব দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এসেছে। বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থান এমনকি বৈশ্বিক কৌশলগত ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত। এশিয়ার দুই বৃহৎ দেশের মধ্যখানে বাংলাদেশের অবস্থান, যার একটি হলো উদীয়মান ভারত। অন্যটি চিন, যা ইতিমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

প্রকৃতির লীলাভূমি এই ভারতও বহুমত, বহুপথ, বহু ধর্মের মানুষকে যুগে যুগে আকর্শন করেছে চুম্বকের মতো। সেই মধ্যযুগে খ্রিষ্টোফার কলোম্বাস ভারত খুঁজতে বেড়িয়ে পথ হারিয়ে পোঁছে গিয়েছিলেন পশ্চিমের কতকগুলো দ্বীপে। আলেকজান্ডার আশাহত হয়ে সিন্ধুনদের ওপার থেকেই ফিরে যান। ঐতিহাসিকদের মতে একেবারে শুরুতে পাকিস্তানের সীমান্তে হরপ্পা ও মহেনজোদারো সভ্যতা প্রাকৃতিক কোন কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে আর্যরা সিন্ধু নদীর তীর ধরে হাটতে হাটতে প্রবেশ করেছিলো এই ভারতে, এবং সে পথেই এসেছিলো আফগানরা এবং একে একে তুর্কি, পর্তুগীজ, ওলোন্দাজ, মোঘল, পাঠান, ইংরেজরা ভারত শাসন করেছে হাজার বছর এবং সময়ের সাথে একটু একটু করে গঠিত হোয়েছে আজকের ভারত। তারও আগে আরব বেদুঈন বনিকরা ভারতের মাটিতে পা রেখেছিলো। এরপর হুন অর্শ্বারোহী, পর্তুগীজ জলদস্যু, আর হালাকু খাঁন, নাদির শাহ সুলতান মাহমুদরা নিয়ম করে ভারতের ধণ সম্পদ লুট করে নিয়ে যেতো। এই ভারতেই জন্মগ্রহন করেন গৌতম বুদ্ধ, গুরু নানক, রামানন্দ, কবির, দাদু, তুকারাম ও চৈতন্যদেব। ধর্মীয় বিবেচনায় ভারত এতসব ধর্মীয় অনুসারী মানুষের সম্প্রীতির এক মেল্টিংপট। হিন্দু রাজাদের রাজ্য, বৌদ্ধ সম্রাট অশোকের সম্রাজ্য, মুসলমানদের সালতানিয়াত, মোঘলদের মুঘলিয়াত, খৃষ্টান ইংরেজদের উপনিবেশ, সবমিলেইতো পাঁচ হাজার বছরের এই ভারতবর্ষ, এক হাজার বছর ছিলো বৌদ্ধদের, আটশত বছর ছিলো মুসলিমদের, দু’শ বছর ছিলো ইংরেজদের। অনেকগুলো দেশের, রাজ্যের, অঞ্চলের সমাবেশইতো ভারত। রাজনৈতিক কারণে বৃটিশদের অন্য উপনিবেশগুলোর মতো পাকিস্হান ও বাংলাদেশ আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম। আবার লক্ষ্য করুন চিন তার সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ এবং সে অনুসারেই নিজের নৌশক্তি গড়ে তুলেছে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। চিন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রতিরক্ষা। প্রাচীনকালের দক্ষিণ রেশমপথ এবং সামুদ্রিক রেশমপথ ছিল দু’পক্ষের যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার মূল মাধ্যম। এ নিয়ে হাজার বছর ধরে প্রচলিত অনেক ঐতিহাসিক ঘটণাবলী। চিনের পরিব্রাজক ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং এর কথা কার অজানা। ওনারা বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সন্ধানে এসেছিলেন বাংলাদেশে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অতীশ দীপঙ্কর চিনে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছেন। চিনের মিং রাজবংশ আমলের সমুদ্রচারী চাংহো’ও দু’বার বাংলা সফর করেন। তিনি লিখেছেন: “এ অঞ্চলের রীতিনীতি সরল। এলাকাটি জনবহুল ও শস্যসমৃদ্ধ। এখানকার উর্বর জমিতে প্রচুর ফলন হয়।’ প্রাচীনকাল থেকেই চিন ও বাংলাদেশ উভয়ই সমুদ্র উপকূলীয় দেশ বিধায় সমুদ্রপথে তাদের মধ্যকার আদান-প্রদান ছিল চমৎকার। প্রায় ৬০০ বছর আগে চিনের মিং রাজবংশের পরাক্রমশালী সম্রাট ছিলেন ইয়ংলে। সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ নাবিক অ্যাডমিরাল ঝেং হে ছিলেন সম্রাটের শান্তির দূত; তিনি ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর পরিভ্রমণ করেন। তিনিই সমুদ্রপথে চিনা সিল্ক রোড সৃষ্টি করেন। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অ্যাডমিরাল ঝেং হে শতাধিক জাহাজের বিশাল বহর নিয়ে সাতটি আন্তসমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন এবং এশিয়া ও আফ্রিকার ৩০টি দেশ ও অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। অ্যাডমিরাল ঝেং হের নৌবহর দুবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল। চিনা দোভাষী মাহুয়ানের গ্রন্হ “য়িং-য়া শাংলান”এর বিবরন থেকে জানা যায় চিনদেশ থেকে ৬২টি জলযান ভর্তি ৩ হাজার চৈনিক প্রতিনিধি ২১ দিনে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে পৌঁছান এবং সেখান থেকে নৌকাযোগে অতিথিদের রাজধানী সোনারগাঁয়ে আনা হয়। বাংলার শাসক সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ তাঁর রাজধানী সোনারগাঁয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানান চিন থেকে আসা অ্যাডমিরালকে। সুলতান পরবর্তী সময়ে একটি দীর্ঘ গ্রীবার জিরাফসহ মূল্যবান নানা উপহার পাঠান মিং রাজার দরবারে। চিনা ঐতিহ্য অনুসারে জিরাফকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়।মাহুয়ান নিজেও ঐ দলে ছিলেন।

চিন-বাংলাদেশ মৈত্রীর ইতিহাসও অনেক দীর্ঘ। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তত্কালীন চিনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই দু’বার ঢাকা সফর করেন। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সেসময় দু’বার চিন সফর করেন। বর্তমানে চিন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগী দেশ। আর বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। চিন ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০০ সালের ৯০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৫ সালে ১৪৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এক্ষেত্রে বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ২০ শতাংশ। বাংলাদেশের পাটজাতীয় পণ্যও চিনের বাজারে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। চিন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সর্বাধুনিক নির্মাণপ্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শাহজালাল সার কারখানা ও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র। বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণের ‘স্বপ্নের সেতু’ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। পরিবহন, বিদ্যুত, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে চিনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই নির্মাণকাজের সাথে জড়িত আছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণে কাজ করছেন ৫ হাজার ৩০০ শ্রমিক। তাঁরা সবাই বাংলাদেশি। তাঁদের সঙ্গে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির (এমবিইসি) ৬৬০ জন চিনা প্রকৌশলী ও স্টাফ রয়েছেন। চিনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক প্রথম দফায় যেসব প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুত বিতরণব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত।
যিষু খ্রিষ্টের জন্মেরও ২২১ বছর আগে চিনের প্রথম সম্রাট কুইন সি হুয়ানডি সর্বপ্রথম বিগত দুইশত বছর ধরে বিবাদমান ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে একিভূত করেন এবং ঐকের প্রতিক হিসাবে নির্মান করেন ৬৪০০ কিমি দীর্ঘ মধ্য এশিয়া থেকে হোয়াংহো নদী পর্যন্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম মনুষ্য নির্মিত প্রাচীর। এটি নির্মান করে তিন লক্ষ যুদ্ধবন্দী দাস। শুধু তাই নয় সম্রাটের নামানুসারে আজকের আধুনিক চিনের নামকরনও হয় ২৩০০ বছর আগে। দখল-বেদখলের ঐক্যবদ্ধ চিন সেই থেকে আজ অবধি আর কখনোই ভাঙ্গেনি বরং এর সাথে যুক্ত হয়েছে হংকং ও পর্তুগালের কলোনী ম্যাকাও। মধ্য এশিয়ার বহিঃশত্রুর আক্রমনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে হলেও চিনের প্রাচীরটি অতিতের মত আজও বিরাট বিশাল এক জণগোষ্ঠীর ঐকের প্রতিক। মাঝে এটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্হ হলেও ১৪৪৮ সালে পূননির্মান করা হয়। আর আধুনিক যুগে প্রায়সই এর শ্রীবৃদ্ধি করে সরকাবগুলো । রেজাউল করিম মুকুল, ২৩ জুন ২০২০খ্রিঃ। মংচিয়ালা গুও। বৈশ্বিক কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত। এশিয়ার দুই বৃহৎ দেশের মধ্যখানে বাংলাদেশের অবস্থান, যার একটি উদীয়মান ভারত। অন্যটি হলো চিন, যা ইতিমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া চিন কর্তৃক বাংলাদেশী ৯৭ ভাগ পণ্যের শুল্কমুক্তির ঘোষণাকে খয়রাতি না বলে খাতির বললেই ভালো হতো।

বাংলাদেশের ৯৭ ভাগ পণ্য বিনা শুল্কে চিনে রফতানি করা যাবে, অর্থাৎ চিনে বাংলাদেশী পণ্যের আমদানী শুল্ক হার শুন্য। আবার চিনে আবিষ্কৃত করোনা ভ্যাকসিন সবার আগে পাবে বাংলাদেশ বিনা মূল্যে। এ রকম দুটি খবরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কি দুঃখ পাওয়া উচিত? না, চিনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে চিনের আজকের সম্পর্ক যখন এতটাই মার মার কাট কাট তখনই চিন সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ভারতীয় মিডিয়ার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দুঃখজনক। ভারতের ‘জি নিউজ’একটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের প্রতি চীনের এই শুল্কমুক্ত বাণিজ্যরীতিকে ‘খয়রাতি’হিসেবে উল্লেখ করেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ও চিনের সম্পর্ক ‘নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে বলেও হতাশা প্রকাশ করেছে সংবাদ মাধ্যমটি। ভারতকে চাপে ফেলতেই বাংলাদেশকে এমন শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ করে দিয়েছে চিন, এমন ভিত্তিহীন মন্তব্য করেছে গণমাধ্যমটি। তবে প্রকৃত সত্য হলো এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্টের আওতায় চিনে আগের থেকে ৩০৯৫টি বাংলাদেশী পণ্য শুল্কমুক্ত ছিলো, এবার নতুন করে ছাড় দেওয়ায় চিনে শুল্কহীন হল ৮২৫৬টি বাংলাদেশি পণ্য। চিন সরকার জানিয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশের আর্থিক উন্নয়নে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে শুল্ক ছাড় ছাড়াও বাংলাদেশে বিনিয়োগও বাড়িয়েছে চীন। মাসখানেক আগে কোভিড-১৯ নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আলোচনাও করেছেন।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই খুবই মজবুত ও বুনিয়াদী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা ভারতের একাত্তরের সরকারের সাহায্য ও সহায়তা এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির আন্তরিক প্রচেষ্টা এত দ্রুত সম্ভব করে তুলেছিলো। যে যাই বলুক একমাত্র প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধি একাত্তরে ভারতের সরকারে না থাকলে এ দেশটি আজও পূর্ব-পাকিস্তানই থেকে যেতো। সেই ভারতে এখন মৌলবাদী চিন্তা চেতনার উদ্ভব ঘটেছে। ভারতকে এখন হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিনত করার নীতি গ্রহন করা হোয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষ্ণগণের ধারণা ভারতের সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজকের অস্হিরতার মূলেই রয়েছে চলমান ধর্মীয় উন্মাদনা যা দেশে বিদেশে সচেতন শিক্ষিত আধুনিক মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। রং বদলায় ঋতু বদলের মতো করে। ভারতের যে গুজরাত থেকে অহিংসার ঝান্ডা উড়িয়ে জাত, পাত, অস্পৃশতা, অচ্ছুত্বতাকে পদদলিত করে সব মানুষকে একিভূত করেছিলেন মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, ভারতের সেই গুজরাত আজ শোনায় মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক দানবের গল্প।

ভারতের নাগরিকত্ব আইন এনআরসি, সিএএ ও এনপিআর সে দেশের অভ্যন্তরিন বিষয় হলেও এসব আইনের লক্ষ্য ভারতের মুসলিম, যাদের অবৈধ্য বাংলাদেশী আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৪৭ পরবর্তি সময়ে ভারতীয় মুসলিমরা আধা হিন্দু আধা মুসলিম হোয়ে দিন গুজরান করছিলেন। এবারে তাদের পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে আসা ডাউটফুল নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারীর দিল্লি হত্যাকান্ড এনাআরসির একজিকিউশন নমুনা মাত্র। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০খ্রিঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথমবারের মতো ভারত সফরের মধ্যেই এনআরসি, সিএএ এবং এনপিআর নাগরিকত্ব আইনের পক্ষে-বিপক্ষে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র হয়ে উঠে রাজধানী নয়াদিল্লি। টানা তিনদিন চার রাতে অগ্নিগর্ভ হোয়ে উঠে উত্তর-পূর্ব দিল্লি। দিনভর রাস্তায় রাস্তায় চলে পাথরবৃষ্টি, অগ্নিসংযোগ, মুসলিমদের দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট। হিংসায় মৃত্যু হয় এক পুলিশকর্মী সহ ৪২ জনের, জখমের সংখ্যা ৩৯০ এবং নিখোঁজের সংখ্যা আরো বেশী। এ যেন ২০০২খ্রিঃ ১৫ অক্টোবরের গোধরাকান্ডের ধারাবাহিকতা। ভারতীয় লোকসভায় ৩১১/৮০ ভোটে পাশ হওয়া এনআরসি এর সংশোধনী সিএএ ভারতের সাম্প্রতিক মুসলিম বিদ্বেশী মনোভাবকে উৎসাহিত করেছে, উস্কে দিয়েছে বহুমাত্রিক সহিংসতা। বিশেষ্ণগণ মনে করেন এটা পূর্ব পরিকল্পিত। কমরেড জ্যোতি বসু বলেছেন সরকারের অনিচ্ছায় দাঙ্গা হয় না, দাঙ্গা হয় সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে। মুসলিমদের ভারত থেকে বের করে দেওয়ার আইন এনআরসি, সিএএ ও এনপিআরকে বাধা দিয়েছে প্রকৃতি নিজেই। মার্চ থেকে ভারতে কোভিড-১৯ এর প্রাদূর্ভাব এনআরসি কার্যক্রমকে থামিয়ে দেয়, সরকারিভাবে বাতিল করা হয় নাই। করোনাভাইরাস শাপেবর হোয়ে ভারতীয় মুসলিমদের রক্ষা করে, এবং এরই মধ্যে লাদাখ সীমান্তে চিনের অবস্হান অনিদৃষ্টকালের জন্য ভারতীয় অভ্যন্তরিন রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। পক্ষান্তরে দেখুন ২০০৯ সাল থেকে কয়েক লক্ষ ভারতীয় নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেমন: এনজিও, গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, আইটি সংস্থায় চাকুরি করেন, উপার্জিত অর্থ হুন্ডি হস্তান্তর পদ্ধতিতে ভারতে পাঠায়। ২০১২ সালে, বাংলাদেশ ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনক্ষেত্র হিসেবে পঞ্চম দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়। সে বছর এই ভারতীয় অভিবাসীরা বাংলাদেশ থেকে ৩.৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার উপার্জন করে ভারতে পাঠিয়েছেন বলে শোনা গেছে। এই অভিবাসীদের বেশিরভাগই পর্যটন ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন, তবে বের হওয়ার কোন প্রবণতা দেখা যায় না।

১২০৬ খ্রিঃ মোঘল যাযাবরদের বিভিন্ন ট্রাইব বা গোত্র একটি কুরিলতাই বা সমাবেশে তিমুজিন নামের এক সাহসী তাবুবাসী যোদ্ধাকে তাদের প্রধান নিযুক্ত করে । সেইসাথে ঐ ব্যক্তির দুঃসাহসী নেতৃত্ব ও যুদ্ধাংদেহী মনোভাবের জন্য তাকে চেংগিস খাঁন উপাধীতে ভূষিত করে । ১১৬৭ সালে জন্ম নেয়া তিমুজিন চেংগিস খাঁন হয়ে ১২১১ খ্রিঃ সবার আগে চীনের উত্তরাংশ আক্রমন ও দখল করে নেন । ১২১৫ খ্রিঃ চেংগিস বেইজিং দখল করেন। ১২৪০ খ্রিঃ চেংগিসের ছেলে ওগোডেই খাঁন রাশিয়া, হাঙ্গেরী, পোল্যান্ড অধিকার করে নেন এবং কিয়েভ নগরী ধুলায় মিশিয়ে দেন। পরের বছর ১২৪১ খ্রিঃ ওগোডেই মারা গেলে ইউরোপ আক্রমন স্হগিত হয়ে যায় কিন্তু মোঘলরা ১২৫৮ খ্রিঃ বাগদাদ দখল করে নেয়। ১২৬০ খ্রিঃ কুবলাই খাঁন পঞ্চম মোঘল সম্রাট মনোনিত হন এবং ১২৭৯ খ্রিঃ চীনের দক্ষিন অংশ দখল করে চীনে প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত ইউয়ান ডায়ানেষ্টি। ১৩৯৭ খ্রিঃ মোঘলরা ভারত আক্রমন ও দখলের চেষ্টা করলেও চেংগিস ও তৈমুরের উত্তরসূরী বাবুরই সফল হয়েছিলেন ১৫২৬ খ্রিঃ যা ১৭০৭ খ্রিঃ পর্য়ন্ত স্হায়ী হয়েছিলো । মোঘলরা ১৩৬৮ খ্রিঃ পর্য়ন্ত চীন এবং ১৩৮০ খ্রিঃ পর্য়ন্ত রাশিয়া দখলে রাখতে পেরেছিলো মিং শাসকরা চীনের এবং মস্কোভিটরা রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে নেয়। এসময় এশিয়ার সমরখন্দে আর এক ইতিহাস বিখ্যাত মোঘল তইমুর লং মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ দেশ দখল করে একটি সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন এবং পূনরায় চীন দখলের প্রস্তুতিকালে ১৪০৫ খ্রিঃ মারা যান। চীন ও বাংলাদেশের জনগণ প্রাচীনকাল থেকেই পরস্পরের ভালো প্রতিবেশী ও বন্ধু। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন কিছু নয়, অনেক প্রাচীন। দুই হাজার বছর কিংবা তারও বেশি আগের সম্পর্ক। বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল যে পথ ইতিহাসে সেটাই সিল্ক রোড নামে প্রসিদ্ধ। পশ্চিমা সিল্ক রোডের সূচনা হয়েছিল রাজধানী সিয়ান (তৎকালীন ছাংআন) থেকে। সেই পথ সিনজিয়াং হয়ে আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে ভারত হয়ে পৌঁছেছিল বাংলাদেশে। চিনারা তখন এ দেশকে বলতো 孟加拉国 মংচিয়ালা গুও। গুও অর্থ দেশ, আর বেঙ্গল টাইগার হলো মংচিয়া। ভাষাবিদরা বলেন চিনাদের মং থেকে বং আর বং থেকেই নাকি বাংলা। হবে হয়তো। কয়েক শতাব্দী ধরে এই মংচিয়ালাই চিন ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের সেতুবন্ধ। আরও একটি সিল্ক রোডও ছিল, যার উৎপত্তি হয়েছিল দক্ষিণ চিনের কুনমিং থেকে। এটার নাম ছিলো পূর্ব সিল্ক রোড যা মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে সংযোগ স্থাপন করেছিল বাংলাদেশের সঙ্গে। এই দুটি পথ ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল, বৃদ্ধি পেয়েছিল সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান। প্রাচীনকাল থেকে চিন নৌ ও স্থলশক্তিতে অত্যন্ত বলবান দেশ হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র ইতিহাসে চিন অন্য কোনো দেশে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেনি, অন্য কোনো দেশ দখল করে নেয়নি। বরং সব দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এসেছে। বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থান এমনকি বৈশ্বিক কৌশলগত ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত। এশিয়ার দুই বৃহৎ দেশের মধ্যখানে বাংলাদেশের অবস্থান, যার একটি হলো উদীয়মান ভারত। অন্যটি চিন, যা ইতিমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

প্রকৃতির লীলাভূমি এই ভারতও বহুমত, বহুপথ, বহু ধর্মের মানুষকে যুগে যুগে আকর্শন করেছে চুম্বকের মতো। সেই মধ্যযুগে খ্রিষ্টোফার কলোম্বাস ভারত খুঁজতে বেড়িয়ে পথ হারিয়ে পোঁছে গিয়েছিলেন পশ্চিমের কতকগুলো দ্বীপে। আলেকজান্ডার আশাহত হয়ে সিন্ধুনদের ওপার থেকেই ফিরে যান। ঐতিহাসিকদের মতে একেবারে শুরুতে পাকিস্তানের সীমান্তে হরপ্পা ও মহেনজোদারো সভ্যতা প্রাকৃতিক কোন কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে আর্যরা সিন্ধু নদীর তীর ধরে হাটতে হাটতে প্রবেশ করেছিলো এই ভারতে, এবং সে পথেই এসেছিলো আফগানরা এবং একে একে তুর্কি, পর্তুগীজ, ওলোন্দাজ, মোঘল, পাঠান, ইংরেজরা ভারত শাসন করেছে হাজার বছর এবং সময়ের সাথে একটু একটু করে গঠিত হোয়েছে আজকের ভারত। তারও আগে আরব বেদুঈন বনিকরা ভারতের মাটিতে পা রেখেছিলো। এরপর হুন অর্শ্বারোহী, পর্তুগীজ জলদস্যু, আর হালাকু খাঁন, নাদির শাহ সুলতান মাহমুদরা নিয়ম করে ভারতের ধণ সম্পদ লুট করে নিয়ে যেতো। এই ভারতেই জন্মগ্রহন করেন গৌতম বুদ্ধ, গুরু নানক, রামানন্দ, কবির, দাদু, তুকারাম ও চৈতন্যদেব। ধর্মীয় বিবেচনায় ভারত এতসব ধর্মীয় অনুসারী মানুষের সম্প্রীতির এক মেল্টিংপট। হিন্দু রাজাদের রাজ্য, বৌদ্ধ সম্রাট অশোকের সম্রাজ্য, মুসলমানদের সালতানিয়াত, মোঘলদের মুঘলিয়াত, খৃষ্টান ইংরেজদের উপনিবেশ, সবমিলেইতো পাঁচ হাজার বছরের এই ভারতবর্ষ, এক হাজার বছর ছিলো বৌদ্ধদের, আটশত বছর ছিলো মুসলিমদের, দু’শ বছর ছিলো ইংরেজদের। অনেকগুলো দেশের, রাজ্যের, অঞ্চলের সমাবেশইতো ভারত। রাজনৈতিক কারণে বৃটিশদের অন্য উপনিবেশগুলোর মতো পাকিস্হান ও বাংলাদেশ আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম। আবার লক্ষ্য করুন চিন তার সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ এবং সে অনুসারেই নিজের নৌশক্তি গড়ে তুলেছে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। চিন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রতিরক্ষা। প্রাচীনকালের দক্ষিণ রেশমপথ এবং সামুদ্রিক রেশমপথ ছিল দু’পক্ষের যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার মূল মাধ্যম। এ নিয়ে হাজার বছর ধরে প্রচলিত অনেক ঐতিহাসিক ঘটণাবলী। চিনের পরিব্রাজক ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং এর কথা কার অজানা। ওনারা বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সন্ধানে এসেছিলেন বাংলাদেশে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অতীশ দীপঙ্কর চিনে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছেন। চিনের মিং রাজবংশ আমলের সমুদ্রচারী চাংহো’ও দু’বার বাংলা সফর করেন। তিনি লিখেছেন: “এ অঞ্চলের রীতিনীতি সরল। এলাকাটি জনবহুল ও শস্যসমৃদ্ধ। এখানকার উর্বর জমিতে প্রচুর ফলন হয়।’ প্রাচীনকাল থেকেই চিন ও বাংলাদেশ উভয়ই সমুদ্র উপকূলীয় দেশ বিধায় সমুদ্রপথে তাদের মধ্যকার আদান-প্রদান ছিল চমৎকার। প্রায় ৬০০ বছর আগে চিনের মিং রাজবংশের পরাক্রমশালী সম্রাট ছিলেন ইয়ংলে। সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ নাবিক অ্যাডমিরাল ঝেং হে ছিলেন সম্রাটের শান্তির দূত; তিনি ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর পরিভ্রমণ করেন। তিনিই সমুদ্রপথে চিনা সিল্ক রোড সৃষ্টি করেন। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অ্যাডমিরাল ঝেং হে শতাধিক জাহাজের বিশাল বহর নিয়ে সাতটি আন্তসমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন এবং এশিয়া ও আফ্রিকার ৩০টি দেশ ও অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। অ্যাডমিরাল ঝেং হের নৌবহর দুবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল। চিনা দোভাষী মাহুয়ানের গ্রন্হ “য়িং-য়া শাংলান”এর বিবরন থেকে জানা যায় চিনদেশ থেকে ৬২টি জলযান ভর্তি ৩ হাজার চৈনিক প্রতিনিধি ২১ দিনে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে পৌঁছান এবং সেখান থেকে নৌকাযোগে অতিথিদের রাজধানী সোনারগাঁয়ে আনা হয়। বাংলার শাসক সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ তাঁর রাজধানী সোনারগাঁয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানান চিন থেকে আসা অ্যাডমিরালকে। সুলতান পরবর্তী সময়ে একটি দীর্ঘ গ্রীবার জিরাফসহ মূল্যবান নানা উপহার পাঠান মিং রাজার দরবারে। চিনা ঐতিহ্য অনুসারে জিরাফকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়।মাহুয়ান নিজেও ঐ দলে ছিলেন।

চিন-বাংলাদেশ মৈত্রীর ইতিহাসও অনেক দীর্ঘ। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তত্কালীন চিনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই দু’বার ঢাকা সফর করেন। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সেসময় দু’বার চিন সফর করেন। বর্তমানে চিন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগী দেশ। আর বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। চিন ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০০ সালের ৯০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৫ সালে ১৪৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এক্ষেত্রে বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ২০ শতাংশ। বাংলাদেশের পাটজাতীয় পণ্যও চিনের বাজারে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। চিন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সর্বাধুনিক নির্মাণপ্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শাহজালাল সার কারখানা ও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র। বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণের ‘স্বপ্নের সেতু’ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। পরিবহন, বিদ্যুত, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে চিনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই নির্মাণকাজের সাথে জড়িত আছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণে কাজ করছেন ৫ হাজার ৩০০ শ্রমিক। তাঁরা সবাই বাংলাদেশি। তাঁদের সঙ্গে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির (এমবিইসি) ৬৬০ জন চিনা প্রকৌশলী ও স্টাফ রয়েছেন। চিনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক প্রথম দফায় যেসব প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুত বিতরণব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত।
যিষু খ্রিষ্টের জন্মেরও ২২১ বছর আগে চিনের প্রথম সম্রাট কুইন সি হুয়ানডি সর্বপ্রথম বিগত দুইশত বছর ধরে বিবাদমান ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে একিভূত করেন এবং ঐকের প্রতিক হিসাবে নির্মান করেন ৬৪০০ কিমি দীর্ঘ মধ্য এশিয়া থেকে হোয়াংহো নদী পর্যন্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম মনুষ্য নির্মিত প্রাচীর। এটি নির্মান করে তিন লক্ষ যুদ্ধবন্দী দাস। শুধু তাই নয় সম্রাটের নামানুসারে আজকের আধুনিক চিনের নামকরনও হয় ২৩০০ বছর আগে। দখল-বেদখলের ঐক্যবদ্ধ চিন সেই থেকে আজ অবধি আর কখনোই ভাঙ্গেনি বরং এর সাথে যুক্ত হয়েছে হংকং ও পর্তুগালের কলোনী ম্যাকাও। মধ্য এশিয়ার বহিঃশত্রুর আক্রমনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে হলেও চিনের প্রাচীরটি অতিতের মত আজও বিরাট বিশাল এক জণগোষ্ঠীর ঐকের প্রতিক। মাঝে এটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্হ হলেও ১৪৪৮ সালে পূননির্মান করা হয়। আর আধুনিক যুগে প্রায়সই এর শ্রীবৃদ্ধি করে সরকাবগুলো ।

লেখক ও সংগঠক, ২৩ জুন ২০২০খ্রিঃ।

শেয়ার করুন