বাড়তি প্রনোদনা আদায়ে তৎপর গার্মেন্ট মালিকরা

প্রকাশিত

মুক্তমন প্রতিবেদন : আসন্ন বাজেটে বাড়তি প্রনোদনা আদায়ে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন দেশের তৈরিপোশাক শিল্পখাতের উদ্যোক্তারা। বিশ্বব্যাপি করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের পৃথক তিনটি প্রধান সংগঠনের নেতারা এজন্যে রাতদিন পরিশ্রম করে চলেছেন। সরকারের প্রভাবশালীদের প্রভাবিত করতে তাদের কাছে ঘন ঘন ধরনা দিচ্ছেন। ব্যবহার করছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা পোশাক শিল্পখাতের উদ্যোক্তাদের। পাশাপাশি সম্ভাব্য বিপর্যয় বিষয়ে দেশবাসিরে অনুকম্পা আদায়ে তুলে ধরছেন করোনার ধ্বংসচিত্র। বিশেষ করে করোনাকালীন অর্ডার বাতিলের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসে শ্রমিকদের কর্মহীন হয়ে পড়ার চিত্রটি তারা বারবার নিয়ে আসছেন দেশবাসির সামনে। আশা প্রকাশ করছেন, করোনাকালীন আসন্ন বাজেট হবে শিল্প ও বাণিজ্যবান্ধব।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৩১৮ কোটি ডলারের পণ্যের রফতানি আদেশ বাতিল বা স্থগিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে আসন্ন বাজেটে তারা সরকারের কাছ থেকে দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারে উৎপাদিত পণ্য রফতানিতে ১০ শতাংশ এবং আমদানি কাঁচামাল ব্যবহারে উৎপাদিত পণ্য রফতানিতে ৪ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা প্রত্যাশা করছেন। চলতি অর্থবছরে এই দুই ধরনের পণ্য রফতানিতে নগদ সহায়তার বিধান রয়েছে যথাক্রমে ৪ ও ১ শতাংশ। তারা চান স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত সব পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট মওকুফ করা হোক, অব্যাহতি দেওয়া হোক রিটার্ন দাখিল করার বাধ্যবাধকতা থেকে। চান ক্রেতাদের বাতিল করা রফতানি আদেশ তথা স্টকলট হওয়া পণ্য বিক্রি করতে চান ভার্চুয়াল মার্কেট প্লেসের অনুমতি। অ্যামাজন-আলিবাবার মতো একটি বিশেষ সার্টিফায়েড সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে কাজ করার অনুমতি চায় বিজিএমইএ।

বাজাটে সংযুক্ত করার জন্য বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ যেসব প্রস্তাব নিয়ে দৌড়ঝাপ করছে তার মধ্যে রয়েছে- ডলারপ্রতি অতিরিক্ত পাঁচ টাকা বিনিময় হার দেয়া, বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা, পরিষেবা বিলের ভর্তুকি মূল্য নির্ধারণ করা, রাজধানী থেকে কারখানাগুলোকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এসইজেড) স্থানান্তরিত করলে বিশেষ কর অবকাশ সুবিধা দেয়া এবং উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করে বাজারগুলোতে (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল) রফতানির ওপর বিশেষ প্রণোদনা দেয়া। তাদের মতে, মৌলিক পণ্যের বাইরে নতুন ক্যাটাগরিতে পোশাক উৎপাদন এবং কারিগরি উৎকর্ষতা উৎসাহিত করার জন্য পাঁচ শতাংশ নগদ সহায়তা প্রদান করা দরকার। এক্ষেত্রে অপ্রচলিত পণ্যে যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য পাঁচ বৎসর মেয়াদি কর অবকাশ প্রদান করা এবং নিজস্ব ডিজাইন ও ব্র্যান্ডের পণ্য রফতানি করার জন্য ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা চায় সংগঠনগুলো। এছাড়াও সরকারের সোশ্যাল সেফটি নেট প্রকল্পের আওতায় পোশাক শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের পুষ্টি, বাসস্থান, যাতায়াত ও শিক্ষাখাতের জন্য ২০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ চান তারা।

বাজেটে নীতিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, বিজিএমইএর নিবন্ধিত কারখানা ছিল দুই হাজার ২৭৪টি, তার মধ্যে এখন এক হাজার ৯২৬টি চলছে। অর্থাৎ বেশকিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। করোনার বিশ্বের ভোক্তার চাহিদা কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থা বলছে, আগামীতে ৬৫ শতাংশ ভোগ চাহিদা কমে যাবে। তাই পোশাকের চাহিদা বাড়ার তেমন সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, দেশের পোশাক কারখানায়ও ৫৫ শতাংশ (চাহিদা) কমে যাবে। ৪২ হাজার কোটি টাকা মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ক্ষতি হবে। করোনায় দেশের ৯৯ শতাংশ পোশাক কারখানা ৫৫ শতাংশ ক্যাপাসিটি দিয়ে চালাতে হবে। জুনে কারখানাগুলোতে ৩০ শতাংশ কাজ হবে। জুলাইয়ে কী হবে তা বলা যাচ্ছে না। আমাদের বড় ধাক্কা খেতে হবে। এটি অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ সহায়তা ছাড়া এ খাতকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

সরকারি সুবিধা আদায়ে বরাবরের ন্যায় এবারও শ্রমিকদের ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে এসেছেন উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, করোনার কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে কাজ হাজাচ্ছে হাজার রহাজার শ্রমিক। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে আইনী সহায়তার পাশাপাশি কারখানা বন্ধ করে সহজে বাড়ী যাওয়ার পথও চাচ্ছেন তারা সরকারের কাছে। গার্মেন্ট মালিকদের বাজেটীয় দাবির মধ্যেই যুক্ত হয়েছে, রুগ্ন ও দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কারখানাসহ যেকোনো সময় উদ্যোক্তারা ব্যবসা থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে তাদের জন্য এক্সিট পলিসি তৈরি করার বিষয়টি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠনেরও দাবি করেছেন তারা। দাবির মধ্যে রয়েছে শিল্পখাত বহুমুখীকরণে কারিগরি ও অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিলের সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তাদের বিশেষ সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া। এজন্য বিশেষ উৎসাহ ও ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা ১০ বছরের জন্য প্রদান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থানান্তর এবং নতুন ভবন নির্মাণ বাবদ বিশেষ ঋণসুবিধা প্রদান, ১৫ বছর মেয়াদি এবং বাণিজ্যিক সুদহারের অর্ধেক হারে প্রদান করার বিষয়টিও।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৈরিপোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের অনেকেই বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপি মুনশি, বস্ত্রমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীরসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের নেতা ছিলেন। বর্তমান সংসদ সদস্যদের এক তৃতীয়াংশ পোশাক শিল্পখাতের উদ্যোক্তা। এছাড়া রফতানি আয়ের ৮৪ শতাংশ অর্জনকারী এ শিল্পখাতের সাথে জড়িয়ে আছে অনেকগুলো অগ্র ও পশ্চাদশিল্প। তৈরিপোশাকের সাফ্যল্যের ওপর নির্ভর করছে লাখ লাখ শ্রমিককের রুটি-রুজির প্রশ্ন। এসব বিবেচনায় আসন্ন বাজেটে এ শিল্পের জন্য ভালো কিছু আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ার করুন