পানিতে ভাসছে হরিরামপুরের চরাঞ্চলের মানুষ

প্রকাশিত

আব্দুর রাজ্জাক(মানিকগঞ্জ): বছরের ৩৬৫ দিনই পদ্মা সাথে লড়াই সংগ্রাম করে চলছে উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ। জেলা শহর কিংবা উপজেলা শহরে আসতে বছর জুড়েই পদ্মা নদীর প্রবল ঢেউ পারি দিতে হয়। আর বর্ষা কিংবা বন্যা হলে চড়ের বাড়ি ঘর,রাস্তা ঘাট,হাটবাজার আর ফসলী জমি সবই অথৈই পানিতে ভাসতে থাকে। ফলে এখারকার হাজারো পরিবারের কষ্টের সীমা থাকে না। এবারের বন্যা তাদের আরো বেশী দুর্ভোগে ফেলেছে।

প্রায় দুই ঘন্টা পদ্মা নদীর প্রবল ঢেউ ডিঙ্গিয়ে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের নটাখোলা,ভগবানপুর ও সলিমপুর চড়ে গিয়ে দেখা গেছে হাজারো পরিবার বন্যার পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে খাবারের অভাব। বন্যার আঘাতে বেকার হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের প্রায় প্রত্যেক পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। কাজ কর্ম হারিয়ে এক ধরনের মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন পরিবার গুলো। প্রায় ২০ দিন ধরে তারা বন্যার পানির সাথে লড়াই করে হাপিয়ে উঠেছে। কেউ তাদের খোজ নিচ্ছে না। প্রত্যেকটি বাড়ির উঠানে পানি আর কারো কারো ঘরে কোমড় পানি। তারই মধ্যে ঘরে মাচা করে কোন রকম রাত পার করে দিচ্ছেন বানভাসি মানুষগুলো। এছাড়া অভাবের কারনে চুলোয় হাড়ি জ্বলছে না অনেকের ঘরেই। আর রান্না করার মতো বেশীর ভাগ পরিবারের চাল-চুলো পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে নারীদের।
ছিলামপুর চড়ের গৃহীনি রুপালি বেগমকে দেখা গেলো বাড়ির পাশে একটু উচু জায়গায় খোলা আকাশের নীচে রান্না করতে। তার চারি দিকে থৈ থৈ করছে পানিতে।

রুপালি জানালেন, প্রায় ১৫ দিন ধরে ঘর দুয়ারে এবং বাড়ির চার পাশে অথৈই পানির সাথে আমরা যুদ্ধ করে চলেছিল। বন্যার কারনে বাড়ির কর্তা বেকার হয়ে পড়ায় ছোট ছোট তিন ছেলেকে নিয়ে অর্ধহারে অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। এই বিপদের সময় কেউ কোন খোজ নিচ্ছেন না। অথচ ভোটের সময় আমাদের কদর বেড়ে যায় তাদের কাছে।
একই চরের আঙুরী বেগম জানালেন, বাড়ি ঘর সবই পানি নীচে। কি যে কষ্ট করে পরিবার নিয়ে টিকে আছি তা উপর আল্লাহই ভাল বলতে পারবেন। আল্লাহ ছাড়া আমাদের এই দুরবস্থা দেখা কেউ নেই।

নটাখোলা চড়ের বাসিন্দাদেরও একই অবস্থা। সেখানের হাজারো পরিবার পানি বন্দি অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। ত্রানের আশায় দুচোখ মেলে তাকিয়ে থাকে পদ্মার দিকে। চরে কোন নৌকা ঢুকলেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠেন সেখারকার নারী,পুরুষ এমকি ছোট ছোট শিশুরাও।
এই চরের অসুস্থ গৃহবধু বিলকিস আক্তার সবে মাত্র পেটে অপারেশন হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। অপারেশনে তার ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাওয়ায় অর্থকুড়ি যা ছিল সবই ফুরিয়ে গেছে। ঘরে চাল নেই,স্বামী সন্তানদের মুখে কিভাবে খাবার তুলে দেবেন এ চিন্তায় তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। জানালেন,বন্যায় স্বামী (রিয়াজুল মিত্রি) বেকার হয়ে পড়েছে। যার কারনে খুবই কষ্টে আছি। চড়ের গৃহীনি বিলকিসের মতো শত শত বিলকিসেরা তাদের পরিবারের স্বামী সন্তান নিয়ে মানবেতর দিন কাটালেও কেউ খোজ নিচ্ছে। চরাঞ্চলের মানুষের আক্ষেপ, ভোটের সময় হলেই কদর বেড়ে যায় গরীর মানুষের। ভোট ফুরিয়ে গেছে তাদের দেখা পাওয়া যায়না।

এদিকে চরের প্রায় প্রত্যেটা বাড়িতেই কম করে হলেও ৩-৪টি করে গরু বাছুর রয়েছে। গবাদী পশু চরাঞ্চলের মানুষের আয় রোজ গারের অন্যতম একটি মাধ্যম। কোরবানীর ঈদের এসব চর থেকে হাজারো গরু বিক্রি হয়। বর্ষা কিংবা বন্যায় এলাকা গুলো তলিয়ে যাওয়ায় এখানে চোর ডাকাতের উপদ্রব বেড়ে যায়। দুর্বৃত্তরা ইঞ্চিন চালিত নৌক নিয়ে মাঝে মধ্যে হানা দেয়। যার ফলে এখানকার মানুষজন গরু বাছুর নিয়ে আতংকে রাত পার করছেন। প্রতিটি বাড়ির সদস্যদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে গরু পাহাড়া দিতে গিয়ে। কথা হয় ছিলামপুর চড়ের কয়েকজন গরু চাষী সঙ্গে। আফজাল হোসেন জানালেন, বন্যায় বাড়ি ঘর সবই তলিয়ে গেছে। অল্প দুরেই পদ্মা নদী । নদীর আর বন্যার পানি একাকার হয়ে যাওয়ায় বাড়ির সামনেই ট্রলার নৌকা ভীড়ানো যায়। যার ফলে ৯টি গরু নিয়ে বিপাকে পরেছি। সব সময় চোর ডাকাতের আতংকে থাকতে হয়। তাই রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে। রাত জেগে গরু গুলো পাহাড়া দিতে হচ্ছে। তার মতো হাজানো গরু চাষী একই আতংকে রয়েছেন।

লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোমা মিয়া জানালেন ১২ হাজার ভোটার রয়েছে আমার এলাকায়। বন্যায় পুরো ইউনিয়নই পানির নীচে তলিয়ে গেছে। রাস্তা,ঘাট,ব্রীজ,কালর্ভাট,হাট বাজার,বাড়ি ঘর সবই পানিতে থৈ থৈ করছে। অভাবের তারনায় চরের প্রায় প্রতিটি মানুষ মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। দুঃখ জনক হলেও সত্যি আমরা কোন ধরনের ত্রান সহায়তা চরের মানুষের কাছে পৌছে দিতে পারিনি। তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের নামের তালিকা শুরু করেছি। হয়তো ঈদের আগে তাদের কাছে কিছু খাদ্য সহায়তা পৌছে দিতে পারবো।

গবাদি পশু সম্পর্কে চেয়ারম্যান বলেন, এটা একটি বড় সমস্যা। পদ্মার চড় হওয়ায় বন্যার সময় গরু বাছুর নিয়ে টেনশনে থাকেন মানুষজন। চোর ডাকাতের আতংকে তারা নির্ঘুম রাত কাটান। এছাড়া গবাদী পশু নিয়ে যারা বিপদে রয়েছেন তাদেরকে আশ্রয় প্রকল্পে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

শেয়ার করুন