নৌকা ট্রলার দেখলেই ত্রাণের জন্য ছুটে আসে হাওরের মানুষ

প্রকাশিত

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জের হাওরে বন্যায় যেদিকে চোখ যায় সে দিকেই শুধু ‘জল-তরঙ্গের” খেলা। হাওরের দ্বীপ সাদৃশ বিছিন্ন গ্রামের বানভাসি মানুষ ট্রলার নৌকা দেখলেই ত্রাণের জন্য ছুঠে আসেন মানুষ। তারা মনে করেন তাদের জন্য কেউ খাবার নিয়ে এসেছেন। ৭-৮ দিনের সৃষ্ট বন্যায় লাখো মানুষের উনোনে বসেনি হাড়-পাতিল। তাদের কাছে থাকা যৎ সামান্য শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটছে তাদের। সরকারী বরাদ্ধে যে পরিমান ত্রাণ বিতরণ হচ্ছে তা তুলনামুলক ভাবে খুবই কম। এখনো অনেক পল্লী গ্রাম রয়েছে যেখানে মানুষ ত্রাণ পায়নি।

সুনামগঞ্জের হাওরের পল্লী গ্রাম চান্দেনগর গ্রামের ৩০ উর্দ্ধ তিন সন্তানের জননী শেফালী বেগম বলেন, ‘ভাই আমরারে কিছু দিবায়নি। চাউল দিবায় না টেহা (টাকা) দিবায়। আমরাতো বহু সময় খাড়া হইয়া তোমরার ট্রলার দেখতাছি। ভাতাছি তোমরা মনে হয় আমরার লাগি কিছু খাওন লইয়া আইতাছো। দিনে কোন কোন সময় এক বেলা-দুই বেলা আধা পেট করেও খাওন পাইনা। বাচ্ছারার কান্দন সইতা ফারিনা, বুকের দুধ দিয়াও চুপ করাইতে পারিনা। এ ভাবেই জীর্নশীর্ণ হয়ে কাতর অবস্তায় চাউল, খাবাব বা কিছু টাকার আকুতি জানিয়েছিলেন অসহায় এই মহিলা। তার মতো সামিনা বেগম তিনি তার সন্তানকে শান্তনা দিয়ে ব্রেড খেতে দিয়ে টিপ-টিপ করে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে পেটের ক্ষুধার না বলা কষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন। বন্যা কবলিত বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে তার মতো জুরমত বিবি, মাফিয়া বেগম, সুলতানা বেগম, জয়নাল আবেদীন, আব্দুল হকসহ অর্ধশতাধিক মানুষ ট্রলার নৌকার শব্দ শুনে ত্রাণের আশায় দীর্ঘক্ষণ বসা ছিলেন নদীর ঘাটে। তারা জানান ট্রলার নৌকার শব্দ শুনতে পেলেই তারা মনে করেন ত্রাণ নিয়ে আসছেন কেউ। এ কারণেই সবাই জড়ো হন এক সাথে ত্রাণ পেতে।

দুই দফা বন্যায় জেলা শহরে কিছুটা পানি কমলেও হাওরের গ্রামে গ্রামে পানি উঠার কারণে তাদের চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, দিরাই-শাল্লা, দক্ষিণ সনামগঞ্জসহ জেলার হাওর পাড়ের বাসিন্ধারা ত্রাণের জন্য নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। বন্যায় তাদের ঘরে ও উঠানে কোথায়ও হাটু, কোমড় পানি প্রবেশ করার কারনে অনেকেই আজ চরম দুর্ভোগে দিন পাড় করছেন। এখন বাঁচার দাগিদে যে কারো কাছে হাত পাততে দ্বিধাবোধ করেননা তারা। এভাবেই চলছে হাওরের জন বিছিন্ন পল্লী গ্রামের বন্যার্ত মানুষের দিনকাল। হাওরের জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের উদয়পুর, নাজিম নগর, শ্রীমন্তপুর, জসমন্তপুর, মিলনপুর সহ বেশ ক’টি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে,বন্যার্ত অনেক পরিবারে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয়, বাসস্থান ও চিকিৎসাসহ নানাবিদ সঙ্কটে ঋণগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে এখন হাহাকার বিরাজ করছে। এই বিপর্যয়ের ঘূর্ণিপাকে পড়ে বানভাসি পরিবারের আর্তনাদ ও কান্না থামছে না।

বানভাসি বিভিন্ন গ্রামের লোকজন এখন একবেলা, আধাবেলা ও অনেক পরিবারের সদস্যদের কোন রকম শুকনো খাবার খেয়ে অভুক্ত থেকে দিন পাড় করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে, তা প্রয়োজনের চেয়ে একবোরেই নগণ্য। যৎ সামান্য ত্রাণ তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। এমন পরিবারও রয়েছে এখনো কোনো ত্রাণ পায়নি। বোরো ধান চাষ করে যাদের গোলায় বারো মাস ধান থাকতো, গোয়াল ভরা গরু আর হাওরের পানিতে মাছ থাকতো, আজ সেই গোলার ধান ভিজে অনৈক পরিবারের মাথায় হাত দিয়েছেন। সপ্তাহ ব্যাপী ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় হাওরে বিছিন্নœ দ্বীপ সদৃশ্য গ্রাম গুলোর অসংখ্য মানুষ তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে আশপাশের উচু স্থানে থাকা অত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে ও বন্যায় কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। কর্মজীবী মানুষেরা এখন কর্মীন হয়ে চরম কষ্টে দিনযাপন করছেন। অশ্রয় কেন্দ্রে ও হাওরে পানি বন্ধি অসংখ্য পরিবার ত্রানের জন্য হাহাকার করছেন। নারী-শিশু, বয়ষ্ক মানুষ, গরু, ছাগল, হাস-মুরগীসহ গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে সব চেয়ে বেশী শংকিত তারা।

সরেজমিন হাওরের অনেক গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে দুর্গম গ্রামগুলোতে দুর্গত মানুষেরা ত্রাণ পাওয়ার আশায় অপেক্ষ করছেন। বন্যার কারণে হাওর এলাকার বয়ষ্ক মানুষ, নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ডুবে যাওয়ার কারণে ঘরবন্ধি নারীরা সবছেয়ে বেশী দুর্ভোগে পঢ়েছেন। শিশুরা পরিবারের লোকজনের অগোচরে হাওরের পানিতে ডুবার ভয় তাদের আতঙ্কিত করছে প্রতিনিয়তই। জেলা প্রশাসনের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স‚ত্রে জানা যায়, জেলার ১১ টি উপজেলায় ৮৫৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে খুলা হয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ছাতক, দোয়ারাবাজার, শাল্লা, দিরাই, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা, জগন্নাথপুর উপজেলা ৯৮ হাজার ৯৫৬ টি পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রাথমিক ভাবে জানা গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৮৫৫ মেট্রিকটন চাল, প্রায় অর্ধ কোটি টাকা, ২ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে ৬৬২ টি গবাদি পশু নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে গোখাদ্য দেয়া হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে বিভিন্ন গ্রামে লাখো কাচা ঘর-বাড়িতে পানি প্রবেশ করায় ঘর-বাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গবাধি পশুর খাদ্য সংকট, পয়:নিষ্কাশনে চরম আকার ধারন করেছে। জেলা শহরের পানি কিছুটা কমলেও হাওরের পানি কমেনি।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ জানান, সুনামগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। নদী ও হাওরে পানি কমছে। মানুষের বাড়িঘর থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি উপজেলায় সরকারের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। একই সঙ্গে প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনা খাবার ও খিচুড়ি বিতরণ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, সুনামগঞ্জ ১ নির্বাচনী পুরোটাই বিশাল হাওর বেষ্টিত। হাওরের প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকার গ্রামগুলোতে বানবাসী মানুষের পাশে গিয়ে প্রতিদিনই খোঁখবর নিচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বন্যা কবলিত মানুষ যাতে কোন কষ্ট না করে সেদিকে বিশেষ নজর রাখছি। আগামীতে হাওর এলাকায় ‘ভিলেজ প্রটেক্সন ওয়াল’ নির্মান করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বন্যায় মারা যাওয়া মানুষকে দাফনের সুব্যবস্থার জন্য হাওর এলাকার কবর স্থান ও শ্মশানগুলো উঁচু করে নির্মান করা হবে।

শেয়ার করুন