নিশাত তাসনিম এর গল্প : শাড়ি

প্রকাশিত

নিশাত তাসনিম : দুপুর আড়াইটা। মীরজাদি ফ্লোরাকে আবার দেখা যাচ্ছে টিভির পর্দায়। আজ সে পরেছে তার কালেকশনের সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা৷ চোখে মুখে প্রফুল্লতা। পুরো বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে টিভির পর্দায়, ফ্লোরার দিকে৷ না, তার শাড়ির সংখ্যা গুনছে না আজ কেউ।

ময়রা আজ মিষ্টি বানাতে বানাতে টিভি দেখছে। বই হাতে ভয়ার্ত উৎফুল্ল চোখে দেখছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। ভার্সিটি পড়া ছেলেটার ব্যাগ গুছানো শেষ, ছোট বোনটা নামাযে বসেছে তার আটকে থাকা এসএসসির ফলাফলের টেনশনে। বাবা খুব লুকিয়ে পকেটে ভরে নিয়েছে লাইটার।

পুরো বাংলাদেশে আজ একযোগে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে একঘন্টার জন্য। সবজির গাছে ছেয়ে আছে ঢাকার সকল বারান্দা আর ছাদ। কিছুই করতে না জানা মেয়েটা আজ বাসার সবার জন্য পেঁয়াজু বানিয়ে টিভির সামনে বসেছে। থেমে আছে পুরো বাংলাদেশ।

মীরজাদি ফ্লোরার হাসি বিস্তৃত হলো। সামনের মাইক্রোফোনটা টেনে নিয়ে সে বলল, “আজ নতুন টেস্ট করা হয়েছে দশ হাজার। নতুন রোগীর সংখ্যা ০। ভালো হয়ে উঠেছেন আমাদের সর্বশেষ করোনা আক্রান্ত রোগীটি৷ বাংলাদেশ আজ করোনামুক্ত।”

আবার থেমে গেলো সবকিছু৷ ১ সেকেন্ড.. ২ সেকেন্ড.. দুপুরের আকাশে একঝাঁক আতশবাজি বিদ্যুৎ চমকানোর মতোই আলো দিলো। জ্বলন্ত ফানুস চোখের আড়াল হলো নিমিষেই । হঠাৎ আলোড়নে চমকে উঠে চোখে না দেখা বৃদ্ধ শ্বশুর ।
-ডেকে উঠে, ” বউমা, ও বউমা, কি হয়ছে? আমাকে একটু বলো কেউ”
-বউমাও আসে দৌড়িয়ে, কাঁদতে কাদঁতে বলে ‘বাবা চলেন বাইরে যাই, আপনার ছেলে আসবে আজকেই।’
বৃদ্ধ অবাক হয়। ছেলে অনেকদিন ধরে আসিনি বাড়িতে৷ কি জানি কি রোগের কথা শুনেছিলো সে। ছেলে আসেনি দেখে বউমাও সারাদিন খিটখিট করতো। বদমেজাজি বউমা আবার কাঁদতেও পারে!!

ময়রা তার বউকে ডেকে বলে, ” কেমন বুদ্ধি করে মিষ্টিগুলো বানিয়েছি বলো। এখনই দেখবে সব বিক্রি হয়ে গেছে।” ময়রার বউ আঁচলে মুখ ঢাকলো নাকি চোখের পানি মুছলো ঠিক বুঝা গেলো না।

মায়ের বকা খেয়ে পড়ার গতিবেগ বাড়ায় এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ফেইসবুকে ক্লাসের গ্রুপগুলো একটিভ হতে থাকে নতুন পোষ্টে৷ ডাক্তার, পুলিশ, স্বাস্থ্যখাতের লোকদের ছুটি দেওয়া হয় শিফট করে৷ তুরাগ, বলাকার বাসগুলোর ইঞ্জিনের জ্যাম ছাড়াতে চেষ্টা করছে ড্রাইভারেরা। পানের ঝুড়ি সাজাতে ব্যস্ত বৃদ্ধ লতিফ৷ গার্মেন্টস গুলোর সামনে বসতে হবে তো।

মীরজাদি ফ্লোরা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলে, এইবার আপনাদের প্রশ্ন করুন। সাংবাদিকেরা সবাই চুপ। কোন প্রশ্ন নেই কারো। পরদিন সকালে সকল দৈনিক সংবাদপত্র একই নিউজ করে, “করোনামুক্ত বাংলাদেশে নতুন ভোর।” সেই সংবাদপত্র বুকে মিশিয়ে কাঁদতে থাকে জনাব রাহমানের স্ত্রী। করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায় জনাব রাহমান। অথচ বিয়ের পর থেকে দুজনেই ভেবেছিলো, ‘একসাথে ভালো সময় পরেও কাটানো যাবে, আগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিই।’ নতুন ফ্ল্যাটের শেষ কিস্তিটা দেওয়া হলেও ঘুরতে যাওয়া হয় নি তাদের…

নারায়ণগঞ্জের আবুল মিয়ার জামদানির ডাকনাম আছে। দীর্ঘদিনের লকডাউনে সে বানিয়েছে তার জীবনের সেরা জামদানীটি।
-পাশের বাড়ির মতিন এসে বলে, “এইটাই তো লাখ টাকা বেঁচবা, মিয়া।”
আবুল মিয়া হাসে। “এই জামদানী বেঁচুম না গো। খবর পরে না বেটি টা? ওই যে করোনার খবর পরে? শুনছি ওর নাকি শাড়ি ভাল্লাগে। এইটা আমি ওরে দিমু। ওরে কই পাওন যাইবো কইতে পারো??” (C)

শেয়ার করুন