নদী খননের বালু ফেলা হচ্ছে কৃষিজমিতে : হুমকীর মুখে অর্ধশত বসতবাড়ি

প্রকাশিত

ঘিওরে ধলেশ্বরী নদী থেকে বালু তুলে ফেলা হচ্ছে কৃষিজমিতে। বালু উত্তলোনের ফলে পাকা সড়কের বেশকিছু অংশ নদীতে চলে গেছে। ছবি : মুক্তমন

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জের ঘিওরে ধলেশ্বরী নদীতে খননকৃত বালু ডাম্পিং করা হচ্ছে কৃষিজমিতে। সেই বালু মিশ্রিত পানি পড়ছে আশপাশের কৃষিজমিতে। এতে ওইসব জমিতে চলতি রবিশস্য আবাদে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। শক্তিশালী খননযন্ত্র দিয়ে বালু উত্তোলন করায় একদিকে যেমন নদীর পাড় ভাঙছে, অপরদিকে পাকা সড়কের বেশকিছু অংশ নদীতে চলে গেছে। স্থানীয় লোকজনদের অভিযোগ, নদী খননে তাদের উপকারের চেয়ে এখন অপকারই বেশি হচ্ছে। খোদ স্থানীয় প্রশাসনও স্বীকার করেছে, নদীভাঙন ও কৃষকদের ক্ষতির কথা।

উপজেলার পূর্বঘিওর এলাকায় ধলেশ্বরী নদী থেকে শক্তিশালী খননযন্ত্র দিয়ে বালু তুলে তা প্রায় আধাকিলোমিটার দূরে কয়েক একর ফসলি জমিতে ফেলা হয়েছে। বিশাল এ কর্মযজ্ঞের ফলে ডাম্পিং স্পট ছাড়িয়ে বালু ও পানি আশপাশের কৃষিজমিতে গিয়ে পড়ছে। শুধু কৃষিজমিতেই বালু যাচ্ছে না, এরই মধ্যে পূর্বঘিওর চকের পানি নামার খালটিও বালুতে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে চলতি বছর রবিশস্য আবাদ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড এর সূত্র মতে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় জেলা সদরের পুটাইল থেকে ঘিওর উপজেলা সদর পর্যন্ত কালীগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর প্রায় ৩০ কিলোমিটার খনন করা হচ্ছে। ১৯ লাখ ঘনমিটার বালু অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তত্ত¡াবধানে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এলাকাবাসী জানান, স্থানীয় ঘিওর পূর্বপাড়া গ্রামের জ্যোতি খোন্দকার, আলিম খোন্দকার ও আরও কয়েক জনের ৩৫০ শতক ওই কৃষিজমিতে এসব বালু ফেলা হয়েছে। চার ফুট উঁচু করে ওই জমি ভরাট করে দেয়ার শর্তে সেখানে বালু ফেলার চুক্তি করেছে জমির মালিকরা। তবে এসব বালু ও বালু সঙ্গে আসা পানি আশপাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে ২০ থেকে ২৫ একর কৃষিজমিতে বালু ভরাট ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে শক্তিশালী খননযন্ত্র দিয়ে বালু উত্তোলন করায় কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্থ ও রাস্তা-বসতবাড়ি ভাঙনের আতংকগ্রস্থ একাধিক কৃষক ও এলাকাবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ বিষয়ে কোন অভিযোগ করলে নানা ধরনের ভয়ভীতি ও প্রশাসন দিয়ে হেনস্থা করার হুমকি ধামকি দিচ্ছে প্রভাবশালী একটি মহল।

ঘিওর পূর্বপাড়া গ্রামের সিদ্দিক শেখের ৫০ শতক জমি রয়েছে। ওই জমিতেও বালু ও পানি পড়ে আবাদ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী সিদ্দিক শেখ বলেন, ‘এবার কয়েক দফা বন্যায় খেত থেকে এমনিতেই দেরিতে পানি নামছে। সরিষা আবাদের জন্য দুই-এক দিনের মধ্যে জমি চাষ দিমু। এরই মধ্যে খেতে বালু ও পানি জমায় সরিষা আর বোনা যাইব না।’

একই ধরনের অভিযোগ ওই গ্রামের মোহাম্মদ রনি। তিনি বলেন, ডাম্পিংয়ের পাশে তার ৬৪ শতক জমির অধিকাংশ স্থানে বালি ছড়িয়ে পড়েছে। বালু সরিয়ে ফেলা না হলে কোনো ফসল আবাদ করা সম্ভব নয়। তারা শুরু থেকেই সেখানে ডাম্পিং না করতে বাধা দিয়ে আসছেন।

বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও ঘিওর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অহিদুল ইসলাম টুটুল বলেন, ঘিওর প‚র্বপাড়া কবরস্থান এবং পাশের রাস্তায় এসব বালু ফেলার কথা ছিল। পরে এসব বালু কয়েকজন মালিকের জমিতে ফেলা হয়। এসব বালু আশপাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে যাওয়ায় ভুক্তভোগী কৃষকরা বাধা দেন। এর পর সেখানে বালু ফেলা বন্ধ রাখা রয়েছে।

ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আইরিন আক্তার বলেন, নদীর পাড়ে বালু রাখার মতো জায়গা না থাকায় কোনো কৃষিজমির ক্ষতি না হওয়ার শর্তে সেখানে ফেলা হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে কৃষিজমি থেকে বালু অপসারণ করতে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে। বালু ফেলতে অন্যত্র স্থানও দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া তিনি স্বীকার করেন, স্থানীয় লোকজন অভিযোগ, ড্রেজিং করার ফলে নদীর পাড় ভেঙে পড়েছে।

নদী খননকাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিআইডাব্লিউটিএ’র উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, চারপাশে বাঁধ দিয়ে মাঝখানে বালু ফেলার ব্যবস্থা করা হলেও কিছু বালু আশপাশে কৃষিজমিতে পড়েছে। খোলা নিলামের মাধ্যমে বালু বিক্রির সময় ওইসব জমি থেকে বালু অপসারণ করা হবে। প্রকল্পে ক্ষতিপ‚রণের বিধানে নেই। তবে ভুক্তভোগী কৃষকদের ক্ষতপিূরণের ব্যবস্থা হবে।

শেয়ার করুন