দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক মেজবার অবাক করা গল্প

প্রকাশিত

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) : তার চোখে আলো নেই। কিন্তু বৈদ্যুতিক কাজ করেন সুচারুরূপে। গাছগাছালিতে চষে বেড়ানো, ক্ষেতখামারের কাজ, মাইকিং করা কোনো ব্যাপারই না তার কাছে! জন্মগতভাবে দৃষ্টি নেই তার। সে এখন বোঝা নয় পরিবার ও সমাজের কাছে। মেজবা নামের এ যুবক মিরসরাইয়ের বিস্ময়। তাকে নিয়ে গ্রামবাসীর যেমন কৌত‚হলের শেষ নেই, তেমনি আছে বুকভরা গর্ব।

মিরসরাই পৌর সদরের মধ্যম মঘাদিয়া গ্রামের জামাল উল্লাহর নয় সন্তানের মধ্যে সবার ছোট মেজবা উদ্দিন। জীবনে কখনো আলোর দেখা পাননি। ভাগ্যে জোটেনি পড়াশোনা। তবে গ্রামের ফোরকানিয়া মাদ্রাসা থেকে নিয়েছে পবিত্র কোরআন শিক্ষা। স্বাবলম্বী হওয়ার যুদ্ধে নেমে মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে শিখতে শুরু করেন বৈদ্যুতিক কাজ। এখন তিনি বেশ সাবলীলভাবেই বিদ্যুতের কাজ করেন গ্রামের ঘরে ঘরে।

একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে এই পর্যন্ত কোনো বিপদে পড়তে হয়নি তাকে।

এ ছাড়া সাবলীল ভাষা আর সুমধুর কণ্ঠে তার মাইকিং সবার দৃষ্টি কাড়ে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোনো অনুষ্ঠান কিংবা নির্বাচনী প্রচারণায় মাইকিং করতে মেজবার বেশ কদর রয়েছে। মাইকে কি বলতে হবে একবার বলে দিলেই হয়। এরপর থেকে মেজবা মাইকিং শুরু করে।

মোবাইল ফোন ব্যবহারে একজন স্বাভাবিক মানুষের চাইতে তিনি মোটেও পিছিয়ে নেই। একবার কারো সঙ্গে কথা হলেই তার কণ্ঠ গেঁথে থাকে স্মৃতিতে। ফোন নাম্বার নিজের সেটে সংরক্ষণ করা, তালিকা থেকে প্রয়োজনীয় নাম্বারটি খুঁজে বের করা, প্রয়োজনীয় অপশনে গিয়ে কাজ সাড়া সবই করতে পারেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেজবা।

মেজবা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই কিছু করার চেষ্টা করেছি। কারণ, জানতাম পরিবার বেশিদিন আমার বোঝা বইতে পারবে না।’ বৈদ্যুতিক কাজে ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে ঝুঁকি মনে হয় না। এই কাজ করতে আমার ভালো লাগে।’

তাকে নিয়ে এলাকাবাসীর গর্বের শেষ নেই। গ্রামের সবার কাছে সমান জনপ্রিয় তিনি। গ্রামের ছেলেদের নিয়ে পিকনিক, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন বিনোদনমুলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মেজবা।

গ্রামে নারকেল, সুপারি কিংবা তাল পাড়তে গাছে উঠতে মেজবার ডাক পড়ে সবার আগে। পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরাও তার কাছে কোনো বিষয় নয়। এ সবের বাইরেও তার আয়ত্তে আছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক ঘটনা। কেউ খবরের কাগজ পড়লে কিংবা আড্ডায় আলোচনা করলে কান পেতে দেন।

এ ব্যাপারে এক কথায় মেজবা বললেন, ‘চেষ্টা করলে কোনো কাজই মানুষের অসাধ্য থাকে না’।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘এলাকায় মেজবা খুব জনপ্রিয়। কেউ ডাকলেই সে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে বিনাবাক্যে।’

কামরুল হোসেন বলেন, ‘মেজবার স্মৃতিশক্তি দেখে আমরা মাঝে-মাঝে অবাক না হয়ে পারি না। সে মোবাইলের কললিস্ট থেকে নাম্বার খুঁজে আমাদের ফোন দেয়। গ্রামের দোকানে বসে মোবাইল সেটে গান শুনে। আশ্চার্যের বিষয়, মেমোরিতে থাকা লিস্ট থেকে সেরা গানগুলো বাছাই করে শুনে সে।’

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেজবা প্রসঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের ট্রাস্টি চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. রবিউল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়া সাধারণত এমন কাজ করা উচিত নয়। তবে ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞান বৈদ্যুতিক কাজের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সাধারণত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের উৎসাহ দেয় না। আমার মতেও তার এমন কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ।’

শেয়ার করুন