তিতাসের ৮ কর্মী বরখাস্ত

প্রকাশিত

মুক্তমন ডেস্ক:নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির ৬ কর্মকর্তা ও ২ কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়া হয়েছে।

দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে এই ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. মামুন তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, সোমবার বিকালে তিতাস কার্যালয় থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এদিকে সোমবার বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ এলাকায় মাটি খুঁড়ে পাইপলাইনে দুটি ছিদ্রের সন্ধান পেয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় ইমরান (৩০) নামের এক গার্মেন্টকর্মী মারা গেছেন। সোমবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে তার মৃত্যু হয়।

এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ২৭ জনের। দগ্ধ ৩৭ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত বেঁচে আছেন ১০ জন। এদের একজনের অবস্থা ভালো হওয়ায় তাকে বার্ন ইন্সটিটিউট থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

বাকি ৯ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এদের প্রত্যেকের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। দগ্ধদের অধিকাংশের মৃত্যু হওয়ায় বার্ন ইন্সটিটিউটের সামনে স্বজনদের উপস্থিতি কিছুটা কমেছে।

মসজিদে বিস্ফোরণে হতাহতের প্রত্যেকের পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। আজ রিটের শুনানি হবে।

দায়িত্বে অবহেলার দায়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হলেন- তিতাসের ফতুল্লা অঞ্চলের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম, উপব্যবস্থাপক মাহমুদুর রহমান রাব্বি, সহকারী প্রকৌশলী এসএম হাসান শাহরিয়ার, সহকারী প্রকৌশলী মানিক মিয়া, সিনিয়র সুপারভাইজার মো. মুনিবুর রহমান চৌধুরী, সিনিয়র উন্নয়নকারী মো. আইউব আলী, হেল্পার মো. হানিফ মিয়া ও কর্মচারী মো. ইসমাইল প্রধান।

সাময়িক বরখাস্তের আদেশে বলা হয়, ‘নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার খানপুর, তল্লা এলাকায় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে গত ৪ সেপ্টেম্বর আনুমানিক রাত সাড়ে ৮টায় বিস্ফোরণ ঘটে।

এ ঘটনায় ২৭ জন মুসল্লি মারা গেছেন এবং আরও ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া মসজিদের সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যে কারণে তিতাসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। মসজিদের বিস্ফোরণজনিত ঘটনা ফতুল্লা জোনের আওতাধীন এলাকায় হয়েছে।

এই দুর্ঘটনা ফতুল্লা জোনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে হওয়ায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান এবং চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হল।’

এদিকে সোমবার বিকাল ৩টার দিকে নারায়ণগঞ্জে বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ এলাকায় মাটি খুঁড়ে পাইপলাইনে দুটি ছিদ্রের সন্ধান পেয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

এর পরও তিতাসের শ্রমিকরা সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মাটি খোঁড়ার কাজ চালিয়ে যান। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মফিজুল ইসলাম বলেন, লিকেজ সন্ধান এবং মসজিদের নিচে কোনো পুরনো পাইপলাইন আছে কি না খতিয়ে দেখতে মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার গ্যাস সরবরাহ চালু করে সেই ছিদ্র দুটি পরীক্ষা করে দেখা হবে।

এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিস্ফোরণস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি গ্যাসের লিকেজের বিষয়ে মসজিদ কমিটি ও এলাকাবাসীর অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে মাটি খুঁড়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

পরিদর্শনকালে বিস্ফোরণের পর পশ্চিম তল্লাসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ও মানুষের ভোগান্তির বিষয়েও অবহিত হন তিনি।

এছাড়া সোমবার জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এ বিষয়ে গণশুনানির আয়োজন করে। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত গণশুনানিতে মসজিদ কমিটির সভাপতি আবদুল গফুরসহ ১৭ জন সাক্ষ্য দেন।

এদিকে লাশের সারিতে সোমবার যোগ হয় গার্মেন্টকর্মী ইমরানের (৩০) নাম। নারায়ণগঞ্জ জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. পার্থ শঙ্কর পাল জানান, সোমবার একজনের মৃত্যু হয়েছে। মামুন (৩০) নামের একজনকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে।

তার দুই পা, হাত, মুখমণ্ডল ও চুল সামান্য দগ্ধ হয়েছে। শরীরের ১০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল মামুনের। ফলে দুপুরে ড্রেসিং করে তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। মামুনের স্ত্রী রুবি আক্তার জানান, সোমবার বিকালে তিনি ছাড়পত্র হাতে পেয়েছেন।

বার্ন ইন্সটিটিউটে এখন চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৯ জন। যাদের প্রত্যেকের শ্বাসনালিসহ শরীরের ৫০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ডা. পার্থ শঙ্কর পাল।

চিকিৎসাধীন ৯ জন হলেন- ফরিদ (৫৫), শেখ ফরিদ (২১), মো. কেনান (২৪), নজরুল ইসলাম (৫০), সিফাত (১৮), আবদুল আজিজ (৪০), হান্নান (৫০), আবদুস সাত্তার (৪০) এবং আমজাদ (৩৯)।

এর মধ্যে ছয়জন রয়েছেন আইসিইউতে। বার্ন ইন্সটিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন, শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় তাদের প্রত্যেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

দুই মাসের মধ্যে সব অবৈধ গ্যাসলাইন অপসারণের নির্দেশ : আগামী দুই মাসের মধ্যে সব অবৈধ গ্যাসলাইন অপসারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

তিনি বলেন, পরিকল্পিত এলাকার বাইরে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংযোগ দেয়া যাবে না। অকোপ্যান্সি সার্টিফিকেট অনুসারে সংযোগ না নিলে দ্রুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

সোমবার গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়ে আলোচনাকালে এ নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অসদাচরণের জন্যই রাজনীতিবিদদের বা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

কোন বিভাগের কোন কোন কর্মকর্তা অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তাদের তালিকা করা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে প্রথমে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে পরে অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা নিন।

ক্ষতিপূরণের রিটের শুনানি আজ : মসজিদে বিস্ফোরণে হতাহতের প্রত্যেকের পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে করা রিটের শুনানি হবে আজ।

বিচারপতি জেবিএম হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি হবে। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার রিটটি করেন।

রিট আবেদনে বলা হয়, মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় বাসিন্দারা গ্যাসলাইন লিকেজের বিষয়টি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের নজরে আনলেও সংস্থাটির স্থানীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন লাইন মেরামতের জন্য।

সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটে। রিটে এ ঘটনার জন্য কাদের দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে, তা নির্ধারণ করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

সরকার দায় এড়াতে পারে না -বিএনপি : নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং আহত-নিহত পরিবারের সদস্যদের অনুদান দিয়েছে বিএনপি।

এ সময় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেছেন, এ ঘটনায় সরকার কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রাণ কাঁদে এ ঘটনায়, তাই তিনি তাদের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তার নির্দেশে হতাহতদের পাশে আছি।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার রাতে এশার নামাজের সময় এ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দগ্ধ হন ৫০ জন। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে ভর্তি হন ৩৭ জন। সোমবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মোট ২৭ জনের মৃত্যু হয়।

শেয়ার করুন