টাকা উইপোকাকে না খাইয়ে করোনা মোকাবেলায় এগিয়ে আসুন

প্রকাশিত

মানিক মুনতাসির : ধরুন আপনি এক’শ কোটি টাকার মালিক। আপনি এই মুহুর্ত পর্যন্ত ভাবছেন আপনাকে করোনা আক্রমন করবে না। কিন্তু যদি কোন কারণে আপনি আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাহলে আপনার মরা মুখ আপনার আত্মীয়-স্বজন দেখার সুযোগ হয়তো পবেন না। আপনার লাশ কোথায় দাফন করা হবে তাও আপনি জানেন না। আর যদি আপনার বা আমার স্বাভাবিক মৃত্যু হয় তাও কিন্তু লাশটা বাড়ির গ্যারেজের ওপরে আর উঠবে না।

কোটি টাকা দামের সোফায় তো নয়ই দামী গালিচা মোড়ানো ড্রয়িং রুমের মেঝেতেও লাশ নেওয়ার অনুমতি থাকবে না। গ্যারেজ থেকেই সরাসরি করবস্থানে। কিন্তু আপনার জমানো কোটি কোটি টাকা খাবে উইপোকায়। কারণ আপনি হয়তো আপনার স্ত্রী-পুত্রকে জানিয়ে যাওয়ার সুযোগও পাবেন না যে কোথায় কোন ব্যাংকে আপনার টাকা গচ্ছিত আছে। এমন কি নগদ টাকা কোন কোন জায়গায় রয়েছে সেটাও হয়তো বলার সুযোগ পাবেন না। কারণ করোনাক্রান্ত হলে আপনার নিকট ভিড়তে পারবেন না আপনার প্রায়প্রিয় স্ত্রীও। ছেলেমেদেরও কথা না হয় বাদই দিলাম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৭৬ হাজারে বেশি কোটিপতি রয়েছেন। আর ব্যাংকে অলস টাকা ফেলে রেখেছেন এমন লোকের সংখ্যাও কমপক্ষে ৩০-৪০ হাজার। প্রতি বছর গড়ে ৫ হাজারের বেশি মানুষ কোটিপতির তালিকায় নাম লেখাচ্ছেন। ১৬ বা ১৮ কোটি জনসংখ্যার এ দেশের বেশিরভাগ সম্পদ হাতেগোনা কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। ফলে দেশের এবং বিশ্বের এই দুর্যোগকালে এগিয়ে আসুন। নিজ দায়িত্বে নিজের হাতে থাকা অর্থ দিয়ে সরকার কিংবা হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করুন। বিশ্ব স্বাস্থ্য ইতিমধ্যে দেশে জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দিয়েছে। তাহলে বুঝুন আমরা ঝুঁকির কোন পর্যায়ে আছি। ফলে হাতে হয়তো সময় খুব কম। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে খুব দ্রুত। সেই সঙ্গে কোটিপতিদেরও এগিয়ে আসা উচিত। সারাদেশে বহু বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে। যেগুলোর সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। সরকারের একার পক্ষে নিশ্চই ১৮ কোটি মানুষের দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়।

রাজধানী ঢাকা, বিভাগীয় শহরসহ সারাদেশে শত শত আবাসিক হোটেল, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকের পাশাপাশি যাদের হাতে প্রচুর অলস অর্থ রয়েছে তাদের উচিত এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের পাশে থাকা। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি এনজিও, ক্লাব, ব্যাংক, বীমা, গ্রুপ অব কোম্পানি, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকেও এই মহামারি ঠেকাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সরকারকে সহায়তা করা উচিত। হয়তো এই শহরের বা গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ কিংবা করোনাতঙ্কে বিদেশ থেকে ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকরা আপনাদের এই সহায়তার ফলে নতুন জীবন ফিরে পাবে।

আপনি যে প্রাসদে আরাম আয়েশে ঘুমাচ্ছেন সেটার দেয়ালে নিশ্চই এ দেশেরই কোন না কোন শ্রমিকের ঘাম লেগে আছে। আপনি আজ যে কারখানার বদৌলতে কোটিপতি কিংবা গ্রুপ অব কোম্পানির মালিক সেটাও নিশ্চই কোন না কোন শ্রমিকের গড়া। আপনি যে দামী কোট, টাই, সাফারি পরছেন সেটাও একজন শ্রমিকেরই তৈরি। আবার কোটি টাকা দামের যে ঝাড়বাতিটি আপনার ড্রয়িং রুমকে আলোকিত করছে সেটাও তৈরি করেছেন এই শ্রমিকেরাই। যদিও এই করোনা চিনবে না কে শ্রমিক, কে মালিক আর কে মন্ত্র্রি, কে এমপি। ইতালীর মত উন্নত দেশে চিকিৎসকরা পর্যন্ত মারা যাচ্ছেন। আমাদের বেলায় কি হবে সেটা হয়তো সময়ের অপেক্ষা। আবার মহান আল্লাহর অনুগ্রহ থাকলে হয়তো আমরা বেচেও যেতে পারি।

সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতিতে আমরা সরকারি হাসপাতালগুলোকে কার্যত অকার্যকর করে রেখেছি। এটা শুধু হাসপাতালের বেলায়ই নয় পরিবহণসহ অন্যান্য সব সেক্টরেই একই অবস্থা। তবে চিকিৎসা খাতটা একটু বেশিই অবহেলার শিকার। কেননা এ দেশ যারা পরিচালনা করেন তারা নিজেরা এবং তাদের পরিবার পরিজনের একটা আঙ্গুল গরম হলে কিংবা সিজনাল ঠান্ডা-কাশি হলেই চলে যান সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভারত কিংবা অন্য কোন দেশে। এ তালিকায় রয়েছেন কোটিপতিরাও। আবার পাতিনেতারাও এই তালিতেই নাম লিখেয়েছেন ইদানিংকালে। কেননা আজকাল পাতি নেতারাও তো কোটিপতি। এজন্য দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে কোন সরকারই সময় উপযোগী উদ্যোগ নেননি। ফলে আমাদের সক্ষমতা সেই মান্ধাতা আমলেই রয়ে গেছে।

একটি সরকারি হাসপাতালের পরিচালক সেই হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক নার্সসহ সেবা প্রদানকারীদের উদ্দেশ্যে চিঠি লিখে সামান্য মাস্ক সরবরাহে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন। আর প্রিভেন্টিভ পোশাক তো দূরের মরিচীকাই। অথচ এই হাসপাতালগুলোর পর্দা, বালিশ আর অন্যান্য মেশিনপত্র কেনার জন্য কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। একটি পর্দা কিনতে ব্যয় করা হয়েছে ৬ লাখ টাকা। আর একটি বালিশ কিনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ হাজার টাকা। কিন্তু প্রয়োজনের সময় ৫/১০ টাকার মাস্ক পর্যন্ত আমরা সরবরাহ করতে পারছি না। আহা! দৈন্যতা। আবার আমরাই কথায় কথায় দেশটাকে সিঙ্গাপুর, কানাডা আর আমেরিকার সাথে তুলনা করি। চীনের উহান শহর থেকেই উৎপত্তি হলেও স্বল্প সময়ের মধ্যে চীন অত্যন্ত শক্ত ও সফলভাবে করোনার বিস্তার রোধ করতে পেরেছে। এটা সত্যি যে চীন পৃথিবীর অন্যতম প্রধান অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির দেশ হিসেবে বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত।

তবে এই মহামারী মোকাবেলায় সবার আগে প্রয়োজন জনসচেতনতা। সব ধরনের জন সমাগম এড়িয়ে চলাও বাধ্যতামূলত। আর আক্রান্ত কিংবা সন্দেহভাজনের তালিকায় থাকাদের কোয়ারেন্টাইনে থাকাটা আরো বেশি বাধ্যতামূলক। এখানেই বোধ হয় আমাদের সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতা। এখানে আসলে সরকারের উদাসীনতাই বেশি দায়ী। ইতালী, জার্মানীসহ করোনাক্রান্ত যেসব দেশ থেকে যারা এসেছেন তাদেরকে খুব সহজেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আর এসব প্রবাসী এখন সারাদেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকা, কানাডা, মালয়েশিয়াসহ আক্রান্ত বড় বড় দেশগুলো জরুরি অবস্থা জারি করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। উগান্ডার মত দেশ যেখানে এখনো সংক্রমনই ঘটেনি তার আগেই তারা সাবধান হয়ে লকডাউন ঘোষণা করেছে। আর আমরা করোনাকে আমন্ত্র্রণ জানিয়ে সেটার বিস্তারের জন্য নির্বাচন পর্যন্ত করছি। অথচ শ্রীলঙ্কা তাদের জাতীয় নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করেছে। আমরা প্রতিনিয়তই সভা সমাবেশ, মিছিল-মিটিং এখনো চালু রেখেছি। সত্যিই সেলুকাস। এই নির্লজ্জতা, বেহায়াপনাই বোধ হয় এবার আমাদেরকে ডোবাবে।

এছাড়া সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং মন্ত্রিরা দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে যে যার মত করে মনগড়া বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ বলছেন, করোনা কোন মারাত্বক ভাইরাস নয়। আবার খোদ ওবায়দুল কাদের বলেছেন করোনাার চেয়ে আমাদের শক্তি বেশি। ফলে আমরা করোনাকে পরাজিত করবোই। হ্যাঁ পরাজিত করবো। সেটা নিশ্চই মুখে মুখে। কারণ করোনা তো আর তর্ক করবে না। মূর্খতাও দেখাবো না। সে কাজ করছে তার মতই। ডিসেম্বর থেকে মার্চ চার মাস সময় পেয়েও আমরা প্রয়োজনীয় মাস্ক, চিকিৎসকদের জন্য প্রিভেন্টিভ পোশাক ম্যানেজ করতে পারি নাই। নিজের পয়সায় কিনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করবো সেটার প্রাপ্তি পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি। আবার প্রতিদিন মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে দাঁত কেলিয়ে চোখ ঘুরিয়ে বলছি আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা প্রস্তুত আছি। হ্যাঁ প্রস্তুত তো! প্রস্তুত আছি মৃত্যুর মিছিল দেখার জন্য। করোনাকে মোকাবেলার জন্য নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহীম খালেদ মনে করেন, যারা অসৎ উপায়ে কোটিপতি, অতিধনী, ধনী হয়েছেন তারা হয়তো এ মুহুর্তে বিদেশে পালিয়ে রয়েছেন কিংবা গা ঢাকা দিয়েছেন। অথচ এটা ছিল তাদের জন্য একটা আত্মশুদ্ধির বড় সুযোগ। অবশ্য বসুন্ধরাসহ কয়েকটা গ্রুপ যাদের বদনাম নেই তারা এগিয়ে এসেছেন। যা প্রশংসনীয়। এটা দেশপ্রেমিক চেনার জন্য অন্যতম একটা সূযোগ বলেও তিনি মনে করেন।।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন।

শেয়ার করুন