জাফর ইকবাল’স ট্রাভেলস

প্রকাশিত

মাসকাওয়াথ আহসান :

জাফর ইকবাল স্বপ্নহানা এক মানুষ; প্রতীচ্যের কপোট্রনিক সুখ দুঃখ তার ভালো লাগেনা।প্রাচ্যে যে মাটির স্বাধীনতার সাথে বাবার রক্ত মিশে আছে সেখানে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। চোখের সামনে একটা স্কুল ঘর আর তার সামনে ঝুম ঝুম বৃষ্টিতে একদল শিশু ফুটবল খেলছে।
–এই যে বাচ্চারা বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর হবে। মাথা মুছে ক্লাস রুমে এসো।
এরকম একটা কয়েক সেকেন্ডের স্বপ্ন তাকে হানা স্বপ্নের মতো তাড়া করে। এ স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে পদ্ম পুকুরে ডুব দিয়ে লাল পদ্ম তুলে এনে ক্লাসে যে ছাত্র কঠিন কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে তাকে উপহার দেবার আরেকটা গভীর আকাংক্ষা এসে হানা দেয়। স্ত্রী ইয়াসমীন হককে একদিন জানায় স্বপ্নের কথা; লোভ দেখায়, তুমি যদি সেখানে যাও আমার সঙ্গে; তোমাকেও একটা লালপদ্ম উপহার দেয়া হবে। কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়া লাগবে না। ইয়াসমীন বলে, কোন অসুবিধা নাই; আমাকেও প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারো। উত্তর দিয়েই উপহার জিতে নিতে পারবো। ইয়াসমীনেরও এই স্কুল ঘর; আর ছাত্র-ছাত্রীর হাসি মুখ; এমন একটি অক্সিজেন চেম্বারের স্বপ্নটা ভালো লাগে। বাচ্চাদের পড়ানোর আনন্দই আলাদা। এক একটা জীবনকে একটু স্নেহ আর জ্ঞানের পরিচর্যায় কিভাবে স্বপ্নের হাউই এর মত উড়িয়ে দেয়া যায়; এ যেন আকাশে স্বপ্নের দীপাবলী।
তারা মাতৃভূমিতে ফিরে আসে। দুজনেই মেধাবী মানুষ। কিন্তু বেয়াইনগরে মেধার এমন বিস্ফোরণ ঘটেছে যে সেখানে কোন স্কুলে শিক্ষকের তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বেয়াই নগর এক বিরাট ব্যাপার; সেখানে সাক্ষাত নিউটন-আর্কিমিডিস এরা স্কুলে পড়ায়; জাফর-ইয়াসমীন তাদের সামনে যেন নস্যি! জাফর ভাবে, ভালোই তো প্রতীচ্যের চেয়ে এগিয়ে গেছে বেয়াই নগরের মেধা। অসুবিধা নেই স্কুল তো স্কুলই; বেয়াইহট্টতে একটি নতুন স্কুল খুলেছে; সেটাকেই যদি নরম কাদামাটি থেকে মনের মতো এক আনন্দ আয়তনে রূপান্তরে হাত লাগানো যায়; সেতো আরো আনন্দের। বেয়াইনগর থেকে ট্রেনে করে বেয়াইহট্ট যাবার পথে জাফর ইয়াসমীনের দিকে তাকিয়ে বলে, দেখো বেয়াই নগরে কোন পদ্মপুকুর নেই; শুধু সুইমিংপুল; স্বপ্নের পুরোটা পূরণেই জন্যই হয়তো আমরা বেয়াইহট্ট যাচ্ছি।
jafor iqbalবেয়াই হট্টতে নেমে স্কুলে পৌঁছে দেখে বিএনপুটিয়ানেরা এসে ঘিরে ধরেছে। ইয়াসমীন ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করে; স্কুলটাকে মাজারের একটা এক্সটেনশান বানানোর চেষ্টা চলছে। জাফর বিএনপুটিয়ানদের বলে, পড়ালেখার পরিবেশ চাই; পড়াতে চাই। জামাত পুটিয়ানদের ভালো লাগে না, ম্যাডামের ঘোমটা কই! উনাদের বাসা থেকে কেন হিন্দু রবীন্দ্রনাথের গান ভেসে আসে! ছাত্র-ছাত্রীরা শুধু শুনবে হামদ আর নাত। বিএনপুটিয়ানরা আশ্বাস দেয়; স্কুল বেয়াই হট্টের মাজার স্টাইলেই চলবে।নাইলে আর্জেস গ্রেণেড তো আছেই।
জাফরের অবাক লাগে, কীসব মধ্যযুগীয় আঞ্চলিকতা নিয়ে পড়ে আছে বেয়াই হট্টের মানুষ। মামুবাড়ীর আবদার; দূরের কোন এলাকার ছাত্র নেয়া যাবে না; শুধু বেয়াইহট্টের ছেলেরাই পড়বে। মেয়েরা না পড়লেই ভালো। পড়লেও হিজাব পরিধান করতে হবে।
জাফর ছাত্র ছাত্রীদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনায়। কত ত্যাগ কত জীবনের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা! ছাত্র-ছাত্রীদের খুব ভালো লাগে এই স্যার-ম্যাডামকে। একদম বন্ধুর মতো। অযথা গম্ভীর হয়ে বসে থাকেনা। কত সহজ করে গল্পের মত করে পড়ায় কঠিন বিষয়। জাফর-ইয়াসমীনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি বিএনপুটিয়ান ও জামাতপুটিয়ানদের ভীত করে তোলে। লীগ পুটিয়ানদের মধ্যে যারা বেয়াই পুটিয়ান আছে তাদের সঙ্গে স্যার-ম্যাডামকে স্কুল ছাড়া করার পরিকল্পনা করে। খুব এক কঠিন সময়ের মাঝে শুধু ছাত্র-ছাত্রীর প্রতি ভালোবাসার টানে জাফর-ইয়াসমীন টিকে থাকে। অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর লড়াই চালিয়ে যায় সমমনা শিক্ষকদের নিয়ে।
জামাতপুটিয়ানদের কিছু ছেলে ঐ স্কুল থেকে পাস করেই পশ্চিমে যায়। অল্প কিছু পড়ালেখা করে আবার এলাকায় বেড়াতে এসে প্রশ্ন তোলে, জাফর স্যার কটা গবেষণা পত্র লিখেছেন! আমি নিজেই তো ছয় খান লিখছি।বেয়াইহট্টের লোক অবশ্য এই প্রবাসী পুটিয়ানদের কথাবার্তা একেবারেই পাত্তা দেয়না। শিক্ষককে শ্রদ্ধা করতে সাধারণ মানুষেরা জানে; শুধু পুটিয়ানেরা জানেনা।
বিএনপিপুটিয়ান আর জামাত পুটিয়ানদের আর্জেস গ্রেণেড শাসনকালের পরেই চলে আসে লীগ পুটিয়ানদের বেয়াই গ্রেণেড শাসনকাল। ফলে বেয়াইহট্টের সাংস্কৃতিক বাতাবরণে তেমন কোন পরিবর্তন আসেনা। লীগ পুটিয়ানদের পূর্ব পুরুষ লীগ মানুষেরা নেতৃত্ব দিয়ে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি্লেন। কিন্তু কালের আবর্তে বেয়াই পুটিয়ান সিন্ডিকেটের দাপটে লীগ পুটিয়ানরাও একই রকম অসভ্যতা করতে শুরু করে বেয়াইহট্টতে। লীগ পুটিয়ানদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে শত্রুপক্ষের শান্তিকাররাও ঢুকে পড়েছে বেয়াইপুটিয়ানদের মাধ্যমে। এক শান্তিকারের ছেলে বলে, ক্ষমতা থাকলে জাফরকে চাবুক মারতাম। সাধারণ মানুষ হাসে; এক হাত বোল্লার বারো হাত শিং!
ওদিকে বেয়াইপুরে শান্তিকার দয়াময় বেয়াই-এর ভাবমূর্তি রক্ষা কমিটি বেয়াইপূজা চালু করেছে। বেয়াই পাছা নামে এক অনলাইন একটিভিস্ট প্রশ্ন তুলেছে, কেন সম্মানিত বেয়াই-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ; মুক্তিযোদ্ধা মানস মুখার্জি কেন ৭০ বছর বয়সে কারাগারে; সেপ্রশ্ন অযথা তুলবেন না। অরুণ গুহের বাড়ী সে অত্যন্ত ন্যায্য দামে দয়াময় মহোদয়ের কাছে বিক্রী করেছেন; এরপর কতটাকায় বিক্রী করেছেন তা ভুলে গেছেন। মমতাপুর থেকে ব্রেণোলিয়া নিয়ে ফিরেছেন, কদিন খেলেই মনে পড়বে। কিন্তু দয়াময় মহোদয়ের বিরুদ্ধে এ ষড়যন্ত্র আমরা ২০১৫-র কসাই কাদেরেরা মেনে নিতে পারিনা।
বেয়াই সমিতির জরুরী বৈঠক বসে। বিরক্ত হয়ে বেয়াই প্রিন্স দ্য লিটল বলে, এসব ফালতু ফেসবুক রাইটার দিয়ে মানুষের মনোযোগ ঘুরানো যাবে না। অন্য কিছু অন্য কোন খানে।
দয়াময় বেয়াই বলে, এদেশে মানুষের উপকার করতে গেলেই বিপদ। ৭১ সালে শান্তিকার আব্বাজান দয়াময়ী ভবনের গুহ পরিবারকে বাকিস্তানের হিংস্র সারমেয়দের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। এবছর আমি এক বিএনপুটিয়ানের দখলের হাত থেকে দয়াময়ী ভবন বাঁচালাম অত্যন্ত ন্যায্য মূল্যে। অথচ কী গুজব চারপাশে! এই যে আমাদের যে শান্তিকারের শান্তিপূর্ণ ভূমিকা এর পরিবর্তে এই কী আমাদের পাওনা ছিলো!
বেয়াই প্রিন্স দ্য লিটলের কাছে বেয়াইহট্ট থেকে একটা ফোন আসে। এক হাত বোল্লার বারো হাত শিং জানায়, একটা ইভেন্ট আছে; জনগণের মনোযোগ বেয়াইপুর থেকে প্রিভেন্ট করে বেয়াইহট্টে সিমেন্ট করে দেয়া যায়।
বেয়াই হনুফা বলে, বেয়াইপুর কেসস্টাডিতে আমরা দেখলাম, সাংবাদিক জেলে পুরলে জনগণের চাপে ছেড়ে দিতে হয়; কিন্তু আটকে রাখা যায় ৭০ বছর বয়েসী শিক্ষক মানস মুখার্জীকে। শিক্ষককে কারাগারে পুরে রাখলে সোসাইটির তাতে কিছু এসে যায় না। সমাজে শিক্ষক আইটেমটাই অপমান-নির্যাতনের জন্য সহজ লভ্য। তাই বেয়াই হট্টতে কিছু শিক্ষককে বেয়াই গ্রেণেডের লাত্থি-কিল-ঘুষি দিলে; গণ কান্দনে মনোযোগ ঐদিকে যাবে; কিন্তু শিক্ষকরা শেষ পর্যন্ত মানস মুখার্জি; যা খুশী করো তাদের নিয়ে; কোন অসুবিধা নাই।
বেয়াই প্রিন্স দ্য লিটল বেয়াইহট্টের শান্তিকারপুত্র লীগ পুটিয়ানকে ইয়েস করে দেয়।
ওদিকে এমনিতেই বেয়াইহট্টের স্কুলে ছাত্রলীগপুটিয়ানদের বাড় বেড়েছে। এমনিতে নাচুনী বুড়ি- তার উপরে ঢাকের বাড়ি।
বেয়াইনগর থেকে লীগপুটিয়ান সমর্থিত এক লোক সাক্ষাত হেগেল সাহেবকে বেয়াইহট্টের স্কুলে হেড মাস্টার করে পাঠানো হয়েছে। শিক্ষকরা তার পদত্যাগ দাবী করে অবস্থান কর্মসূচী পালন করে। শিক্ষকদের অবস্থান ধর্মঘট; প্রধান শিক্ষক লীগ পুটিয়ান হলেও একজন শিক্ষকতো। পুলিশের সাহায্য নিয়ে দপ্তরে যেতে পারেন; কিংবা একদিন দপ্তরে না গেলেতো পৃথিবী ভেঙ্গে পড়ছে না। আর শিক্ষকদের ব্যাপার তারাই বুঝুক। কিন্তু না ছাত্রলীগপুটিয়ান কতিপয় এসে শিক্ষকদের কিল-চড়-ঘুষি-লাথি দিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে ঢেকে দেয় অপমানের কালো মেঘে। ছাত্রলীগপুটিয়ানদের হামলায় শিক্ষিকা ইয়াসমীনও নিঃগৃহীত হন। বেয়াই গ্রেণেডে ঘটনাস্থলে কেউ শারিরীকভাবে মারা যাননা; মারা যান মানসিকভাবে। সন্তানের হাতে প্রহৃত হওয়ার চেয়ে বড় অপমান আর কী হয়! ঘটনাস্থলে একটি জীবন্মৃত জাফর ইকবাল স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। ঝুম ঝুম বৃষ্টির জলে মিশে যায় নোনা-অশ্রু। তিল তিল করে শিক্ষকেরা একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরী করলেন। আর্জেস গ্রেণেডের সেই ভয়ংকর দিনগুলি কোনমতে পার করে যখন আশায় বুক বেঁধেছিলেন, এ বুঝি বোধের কাল-আলোকায়নের কাল; অথচ সব স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে গেলো কিছু বুনো মোষ। স্বপ্ন না থাকলে আর কী থাকে! ম্রিয়মাণ জাফর বলেন, এর চেয়ে আত্মহননই শ্রেয়।
সারাদেশের বোধসম্পন্ন মানুষ ধিক্কার দেয়। জাফর স্যারকে স্বপ্নের কাছে ফেরাতে চায় ওরা।
বেয়াইহট্টের শান্তিকারের ছেলে লীগপুটিয়ান এক হাত বোল্লার বিরাট বড় শিং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবে, এখন নিশ্চয়ই আমাকে জাফরের চেয়ে লম্বা দেখাচ্ছে।
বেয়াইনগরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেয়াই দ্য লিটল প্রশান্ত হাসি হেসে বলে, ডিসট্র্যাকশান ইনডিড।

অথচ সারাদেশের স্বপ্নাহত মানুষেরা জাফরের স্বপ্নখুনের নৈরাজ্যে তীব্র ঘৃণায় উচ্চারণ করে, ডেসট্রাকশান ইনডিড।

লেখক : সাংবাদিক, লেখাটি লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া।

শেয়ার করুন