করোনায় ব্যক্তিগত হতাশা : হয়তো সারা বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি!!

প্রকাশিত

নাজমুল করিম : করোনার ভয়াল আক্রমণ যখন চায়নায়, ওখানকার ব্যবসায়ীক বন্ধুরা বার বার সতর্ক করছিলো এবং আশংকা করছিলো এটি দ্রুতই ছড়িয়ে পরবে বাংলাদেশ কিংবা সারা বিশ্বে। তাই আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগটা ছিলো প্রথম দিকেই।

মনে আছে, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই বসেছিলাম আমার প্রতিষ্ঠানের সহযোগীদের নিয়ে কিভাবে করেনার দুর্যোগ মোকাবিলা করা যায়। যদিও তখন সুনির্দিষ্ট স্বাস্হ্য সুরক্ষা বিষয়ে গাইড লাইন ছিলো না, তদুপরি এলোমেলো অনেক উদ্যোগ নিয়েছি,যেমন মাস্ক, স্যানিচাইজেশান সামগ্রী ইত্যাদি ক্রয় করা কিংবা অফিস বা বাসা পরিষ্কার রাখা, অফিসের খাদ্য তালিকায় ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করা ইত্যাদি।

অফিস কর্মীদের অনেকে বিষয়টির গুরুত্ব অতটা না বুঝলেও প্রস্ততিতে ঘাটতি রাখেনি। চীনের করোনা উত্তরণের হিসাব ধরে ভাবলাম আমরা বড় জোর দুই মাসের মধ্যে মুক্তি পাবো। কিন্তু সব আশায় গুঁডে বালি, করোনা প্রতিরোধে “হেলায় সুবর্ণ সুযোগ” হারালাম।

সাধারন মানের একজন ব্যাবসায়ী হয়ে নিজেসহ প্রায় ৬০ জন সহযোগী নিয়ে দীর্ঘ দুই যুগের বেশী সময়ে তিল তিল করে গড়ে উঠানো প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ৬০-৭০ টি পরিবার সহ নিজে বাঁচার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ২১ শে মার্চ প্রথমে কেম্পানীর অর্ধেকরও বেশী সদস্যকে স্ববেতন ছুটিতে পাঠালাম। ২৫শে মার্চ বাকীদের। নিজে প্রধান হয়ে ৭-৮ জনকে নিয়ে তৈরী করলাম ইর্মাজেন্সী ব্যাকআপ টিম।

ইতিমধ্যে এক ধরনের প্যানিক তৈরী হয়েছে। একদিকে বন্দরে কোটি টাকার মালামাল। সাধারন ছুটি নামক লকডাউনে জীবন বাজি রেখে ছুটলাম ব্যাংক, কাস্টমস কিংবা বন্দরে। পদে পদে অপদস্থ। ব্যাংক সপ্তাহে ২ দিন খোলেতো ব্যাংক কর্মকর্তা আসে না। কাস্টমস একদিন খোলেতো সেখানকার কর্মকতা আসেনা, আবার আসে তো ঘুষ ছাড়া ফাইলে সাইন করে না। বন্দর মালামাল ছাড়ে না আবার জরিমানার হুমকি দেয় কিংবা ঘুস ছাড়া নড়ে না। দ্বিগুন দামে ট্রাক লরী পাই না। সে এক ভয়ংকর অবস্হা। পুলিশ ভাইদের বুঝিয়ে কোনভাবে বের হই কিন্তু দিনশেষে কাজ শেষ করতে পারি না।

এদিকে বাসায় পরিবারের লোকজন দুশ্চিন্তায় অস্থির। একমাত্র ছেলে আমেরিকায় লেখাপড়ার জন্য। ততদিনে করোনায় আমেরিকার অবস্হা খারাপ। ফেরার কোন সুযোগ নাই। দুঃচিন্তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একঝাকঁ তরুন সহযোগী কোম্পানী বাঁচানোর প্রচেষ্টায় অফিস, ওয়্যার হাউস কিংবা ওয়ার্কসপ্লেসে থাকার জায়গা বানিয়ে লড়াই চালাতে লাগলাম। ক্লায়েন্টের ভরসা দিলাম, এটি একটি যুদ্ধ, মনোবল হারানো চলবে না, যদিও একেরপর এক সব ইন্ডাষ্ট্রি বন্ধ হতে লাগলো।

প্রথম দিকে সরকার দূর্দান্ত সিদ্ধান্তে নিয়ে চায়নার যোগাযোগ বন্ধ করে সংক্রামন নিয়ন্ত্রণ করলো। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপ থেকে আক্রান্তরা দলে দলে ঢুকে গেল। এরপর মাদারীপুরের শিবচর লকডাউন করে বল কিছুটা নিজেদের কোর্টে নিয়ে আসলো। আশান্বিত হলাম। তারপরই সব লন্ড ভন্ড। লক ডাউন নামের সাধারন ছুটি, জানিনা কোন উর্বর মস্তিষ্কের আমলা কিংবা সরকারের মাথা থেকে এ শব্দ আসলো। এরপর বন্ধ-খোলা খেলায় আম ছালা সব গেলো। অর্থাৎ জীবনও গেলো, অর্থনীতিও গেলো। করোনার ব্যাপক চাষাবাদ হয়ে গেলো।

হতাশা বাড়তে লাগলো। সরকার প্রনোদনা, সুদ মওকুফের ঘোষনা দিলো। সেটি আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের জন্য নয় যদিও। তাও দৌড় ঝাঁপ করে আবেদন করলাম। ব্যাংক বলে, প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতায় বলেছে, সেটা বক্তৃতার ব্যাপার, “ঘরে চাল না থাকলে রেঁধে খাওয়াবো কোত্থেকে?” কথা ঠিক না বেঠিক বুঝি না। হতাশার পারদ বাড়তে থাকে। ব্যাংক থেকে আর ঋন নেয়ার সুযোগ নেই, অর্থ্যাৎ কোটা পূর্ন। ব্যাংকের সুদ বাড়ছে ঘড়ির কাঁটা ধরে। শিল্প কারখানা বন্ধ, মালামাল নষ্ট। কিভাবে ব্যাংকের টাকা ফেরত দিবো। বেতন ভাতা, অফিস ভাড়া ইত্যকার খরচ চলমান।

এদিকে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু, কিংবা পরিচিতজনের হাহাকার। নিজের চেষ্টায় কিছু সহযোগীতার হাত প্রসারিত করা। কিন্তু কথায় বলে, সাহায্যর চাল ভাতে বাড়ে না। তারাও ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে থাকে। আর করোনা বাড়তে থাকে। মনে হয় করোনা এ দেশে এসে মজা পেয়েছে। বাড়ার কিংবা কমার হার কোনটিই অন্য দেশের সাথে মেলে না। করোনা থেকে বাঁচার জন্য পুদিনা পাতা থেকে হোমিওপ্যাথী হয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার সব ব্যবস্হা করলাম। একটা করি তো আরেকটা শুনি। সবাই পরামর্শ দেয় ভালোর জন্যই। ইতিমধ্যে অফিসের একজন গুর্রুত্বপূর্ন সহযোদ্ধা পরিবার সহ আক্রান্ত। তাই সর্তকতা হিসেবে নিজেসহ অন্য সহযোগীদের নিয়ে কোভিড টেষ্ট করালাম। শুকরিয় আল্লাহকে এ যাত্রায় সবাই আপাতত নিরাপদ। আর কোভিড টেষ্ট, সে তো মহা ব্যপার। যারা ভুক্তভোগী তারা জানেন, কি চমৎকার ব্যবস্থ্যা! নিজে সহ সহযোগীদের বাঁচাতে হবে, বাঁচাতে হবে প্রতিষ্ঠান না হয় সর্বশান্ত হয়ে পথে বসবে অনেকগুলো পরিবার।

খুলতে শুরুর ঘোষনা দিলো। কিছু শিল্প কারখানা খুললো। নতুন সমস্যা। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় অনেক যন্ত্রপাতি কাজ করে না। বিকল হয়ে গেছে বিশেষত সেন্সর বেইজ ইলেকট্রনিক মেশিনারীজ। যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনা সময় সাপেক্ষ ।শ্রমিকরা কাজে আসে না। জীবন বাঁচাতে হবে। যদিও অনেকে বলছেন ছাঁটাই চলবে না। খবর নিয়ে দেখেন? শ্রমিকরা কাজে আসে কি না? সামনে অন্ধকার। কত আর যুদ্ধ। ভয়ে টেলিভিশন দেখি না। যদিও দেখি, শুধু বিটিভি দেখি। ভালো সব খবর। আল্লাহ বিটিভির হায়াত দারাজ করুক ভালো ভালো সংবাদ পরিবেশনের জন্য।

কারখানা মালিকরা হতাশ, মেসিনারীজ আউট অব অর্ডার, শ্রমিক কাজে আসে না, কাঁচামাল সংকট, উৎপাদিত পন্য রপ্তানী কিংবা দেশীয় বাজারে ক্রেতা নেই। করোনার আগের উৎপাদিত পন্যই অবিক্রীত হয়ে স্তুপকায়। একদিকে শ্রমিক কর্মচারীর বেতন ভাতা, ইউটিলিটি খরচ, ব্যাংক ঋনের সুদ আবার যারা এক্সন্পাশান করেছেন, মেশিনারীজ এসেছে, বিদেশী বিশেষজ্ঞ ছাড়া ইন্স্টলেশন করা যাবে না, তারা আরো বিপাকে, বিদেশীদের আসা বন্ধ, যারা ছিলো তারাও চলে গেছে। মেশিনারীজ দীর্ঘ সময অব্যবহৃত পড়ে থাকলে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ব্যাংক সুদের চাকা কিন্তু সদা চলমান। সুতরাং শিল্প কারখানা এবং তার মালিকদের দেউলিয়া হবার আশংকা। মালিক দেউলিয়া হলে শ্রমিক কর্মচারী বাঁচবে না।

ভেবেছিলাম করেনাকালের মেয়াদ হবে দুই থেকে তিন মাস। কিন্তু সদা তৎপর স্বাস্থ্য মন্ত্রকের মেহেরবানীতে এটি যে বছর শেষের আগে কোন উপসংহারে পৌঁছাবে না, সেটি বুজতে মনে হয আর বাকী নেই। কারন পুকুরের মাছ বিলের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে, এখন বিল থেকে মাছ ধরার চেষ্টা। কি চমৎকার মগজ! আর ধরবেন টা কে? যারা ধরবে মানে প্রসাশন তারা নিজেরাই করোনায় এখন ধরা খেয়ে ছোটাছুটি করছে।

ইতিমধ্যেই চারিদিক থেকে আসছে পরিচিত আত্মীয় বন্ধু পরিচিত জনের ক্রমাগত মৃত্যুর সংবাদ। অন্যদিকে চিকিৎসাতো নেই, মরলে দাফনের জায়গা হবে কিনা, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। অবস্থা ক্রমশ জটিলতার দিকে যাচ্ছে। মরলে দাফনের জায়গা নাই আর বাঁচলে নির্ঘাত ব্যাংক ঋনের দায়ে দেউলিয়া হয়ে জেলের ভাত। এখন বুঝছি পৃথিবীর বড় বড় ব্যবসায়ীরা কেন দেউলিয়া হয়, কেনই বা আত্মহত্যা করে?

হতাশার তীব্রতা এবং ক্লান্তি মানষিক শক্তিকে ধীরে ধীরে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তাই অনেক সময় বিনা খরচে ফেসবুকের পাতায় দু’চার লাইন লিখে মনকে হাল্কা করার চেষ্টা করি। সেখানেও সমস্যা। বন্ধুরা ভয় দেখায়, “পন্ডিতি করিও না, একেবারে গুম করে দিবে?” মাঝে মাঝে ভাবি, আচ্ছা গুম হলে কি কবর দেয়? দাফন কাফনের এই দূর্মূল্যের সময়, গুম একেবারে খারাপ না। অন্তত পরিবার কিংবা বন্ধুরা এ দূর্যোগের সময় দাফন কাফন নিয়ে পেরেশানী হতে হবে না।

এসব এলোমেলো ভাবনা, বিশ্বাস করি আজ শুধু আমার না। এটি গোটা বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। কেউ কেউ বলে আবার কেউ কেউ হজম করে। কেউ ভাবে করোনা আমারে ধরবে না, কারন আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী, যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে নিজে সটকে পড়ে। পার্থক্য এই যা, পরিনতি কিন্তু অবশ্যম্ভাবী। সেটা করোনা দেখিয়ে দিলো। পি কিংবা আই পি কিংবা ভিআইপি কিছুই মানে না। পরিশেষে ক্ষমা করবেন বিরক্ত উদ্রেকারক লেখালেখির জন্য। সময় খুব খারাপ হয়তো এখানেই হবে জীবনে পরিসমাপ্তি মেনে নিতে হবে করোনা মৃত্যু অথবা আত্নহত্যা মৃত্যু।এটি শুধু আমার নয় সারা বাংলাদেশের সাধারন মানের উদ্যাক্তাদেরই প্রতিচ্ছবি।

লেখক : ব্যবসায়ি, কলামিস্ট ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

শেয়ার করুন