করোনার শিক্ষা : রাজনীতিবিদদের দ্বায়ভার ! আমলাদের ব্যর্থতা !!

প্রকাশিত

নাজমুল করিম : সাম্প্রতিক কভিড -১৯ এর ভয়াবহ দূর্যোগ সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও এক বিশাল চ্যাল্যান্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এটি এমন এক দূর্যোগ যা সরকারগুলো নিকট অতীতে কল্পনাও করতে পারেনি।প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের দূর্যোগেই একটি সরকারের দূরদর্শীতা , যোগ্যতা এবং সুষ্ঠভাবে সম্পাদনের মাধ্যমে প্রশংসিত হয় । কারন এতে সমগ্র জনগোষ্টির সংশ্লিষ্টতা থাকে । সরকারের এ কাজগুলো সুচারুরুপে সম্পাদনের জন্য নিবেদিত থাকে একদল দক্ষ, সাহসী , দূরদর্শী, সৎ, নিষ্ঠাবান, নিবেদিতপ্রান কর্মকর্তা কর্মচারী যাদের নিয়োগ থেকে কবর পর্যন্ত এবং পেশাগত দক্ষতা ও জনসেবামূলক আদব কায়দা শেখানোর জন্য রাষ্ট্র সকল ব্যয়ভার বহন করে । কিন্তু আজ তাদের অর্থ্যাৎ এসব সরকারী কর্মচারীদের দৈন্যতা অতীতের সকল কিছুকে ছাডিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে । সংগতকারনেই তাদের এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপর বর্তাচ্ছে কারন জনগন একে সরকার মানে রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচনা করবে । রাজনৈতিক সরকারের জনগনের নিকট জবাহদিহীতা রয়েছে , কিন্তু এসব আমলাদের কি কোন পর্যায়ে এরুপ জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা গেছে ? রাজনৈতিক সরকারের ব্যর্থতার জন্য সরকার পরিবর্তন , ক্ষেত্র বিশেষে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জেল কিংবা আরো বড় ধরনের সাজার মুখামুখি হতে হয় , যদিও ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি , একজন রাজনীতিবিদ থেকে কোন কারনে জনগন মুখ ফিরিয়ে নেয়াই রাজনীতিবিদের জন্য সবচাইতে চরম শাস্তি ।

রাজনৈনিতক নেতৃত্বের সিদ্বান্তসমূহ বাস্তবায়নের গুরুভার যাদের উপর ন্যস্ত , প্রশ্ন আসে তারা কি এ কর্তব্য পালনের জন্য যথোপযুক্ত । বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক উত্তর আসবে ? তাহলে কেন এই শ্বেতহস্তী পালন করা হচ্ছে ? কেনই বা তাদের জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না ? যদিও আমাদের দেশে উল্লেখ করার মতো অনেক আমলা ছিলেন এবং আছেন , তদুপরি আমার ভুল না হলে বলতে হবে শতাংশের হারে অযোগ্য , অদক্ষদের সংখ্যা হয়ত ভালোই হবে , যাদের কারনে যোগ্যরাই যথাযথ ভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না অথবা আলো ছাড়তে পারে না ।

স্বাধীনতাত্তোর কাল থেকেই এদেশে জন্ম হয়েছে এলিট শ্রেনীর আমলা যারা জনগনের সেবক নয়, শাসক হিসেবে আর্ভিভূত হয়েছে । এরা সকল সময়েই সকল রাজনৈতিক সরকারের তল্পীবাহক হিসেবে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে এমন কি রাজনৈতিক কর্মী ফুলের তোড়া তার নেতাকে দেয়ার আগে আমলা নেতার দরবারে হাজির হয় । যে রাজনৈতিক কর্মী জীবন বাজি রেখে নেতাকে নির্বাচিত করলেন , নির্বাচনের পরদিন নেতার সাথে দেখা করার জন্য তাকে এসব আমলাদের অনুমতি নিতে হয় । অর্থ্যাৎ এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল তৈরী করে জনগনের নেতাকে আমলাদের হাতের পুতুলে পরিনত করা হয় ।প্রাথমিকভাবে জননেতা আর তার কর্মীর মধ্যে তৈরী হয় দূরত্ব । আর বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই , এসব আমলাদের ট্রাপে পা ফেলে অভিজ্ঞ নেতারা । ইতিহাস পর্যালোচন করলে দেখা যায় বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব যারা মন্ত্রী কিংবা এম , পি হয় ,তাদের অজনপ্রিয়তা বা বিতর্ক শুরু হয় নিজ দলের একনিষ্ট কর্মীদের কাছ থেকে যা ধীরে ধীরে সংক্রামিত করে নিজ দলের সমর্থক থেকে শুরু করে সাধারন জনগনের মধ্যে ।অথচ আমলার কাজ হলো নিরপেক্ষ ভাবে নির্দেশ বাস্তবায়ন করা । এটিসাংবিধানিক শপথের অংশ । সশ্রস্ত্র বাহিনী যেমন শপথ নেয় , নির্দেশ আশা মাত্র জীবন বিপন্ন করে হলেও যুদ্বে অংশ গ্রহন করে ।

নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছতা, অতি মাত্রায় প্রশাসনকে রাজনীতিকরণই বস্তুত অদক্ষ মেধাহীনদের জন্ম দেয় , যাদের কাজ হলো , তোয়াজ করা এবং সত্য মিথ্যা মিশ্রিত তথ্য দেয়া । ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব একদিকে তার স্বীয় কর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয় , ফলে মাঠের সঠিক তথ্য পায় না , অন্যদিকে তোয়াজকারী আমলাদের গড়মিল তথ্য , নেতৃত্বেকে সঠিক সিদ্ধান্তে নিতে সহায়তা করে না । আমরা যদি কোভিড -১৯ নিয়ে প্রথম দিক থেকে আমলাদের দেয়া প্রত্যেকটি বক্তব্য এবং তথ্য বিশ্লেষন করি এই সত্যতাই বেরিয়ে আসবে।আমার ব্যক্তিগত অভিমত করোনায় বাংলাদেশের আজকের বিপপর্যের পিছনে কাজ করেছে এসব আমলাদের ভুল কিংবা মিথ্যা তথ্য এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে তাদের অতি কথন বাঁচাল বর্তমানের কতিপয় ওয়াজকারী মোল্লাদের মতো ।স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এদের এসব বক্তব্য কিংবা ভুল তথ্য নিয়ে প্রকাশ্যেই উস্মা জ্ঞাপন করেছে।

স্বাস্হ্য অধিদফতরের অতি কথন এবং ভুল ভাল অবিবেচক সিদ্ধান্তসমূহ শুধু যে সরকারকে বিব্রতকর এবং জনগনকে আশংকাজনক অবস্হায় ফেলেছে তা নিয়ে বলতে যেয়ে এ লিখাকে দীর্ঘায়িত করতে চাই না । শুধু সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া দুটো ব্যক্তিগত ঘটনার উদাহরন দিয়ে আমলাতন্ত্রের অর্জন কিংবা অবক্ষয়ের উল্লেখ করবো । জনবান্ধব আমলাতন্ত্রের রুপ হচ্ছে , জনগনকে সহযোগিতা করা । ভ্যাট সংক্রান্ত ব্যাপারে কতিপয় অনৈতিক ভ্যাট কর্মচারী দ্বারা নিগৃহীত হয়ে জীবনে প্রথম বারের মতো ভ্যাট অফিসে যেয়ে মেম্বার ভ্যাট থেকে কমিশনার পর্যন্ত উর্ধতন কর্মকর্তাদের যে অভাবনীয় শিষ্টাচার , আন্তরিক আতিথেয়তা এবং পেশাদার আচরন পেয়েছি সত্যিই আমাকে অভিভূত করেছে । এখানে বলতেই হবে আমাদের দেশে অনেক সত্যিকারের দেশপ্রমিক কর্মকর্তা আছেন ,যাদের জন্য গর্ব করতে হয় । অন্যদিকে সাম্প্রতিক কালের আমার মুক্ত চিন্তার লিখন নিয়ে আমারই জনৈক সহপাঠী নন – ক্যাডার কর্মকর্তা অপ্রাসজ্ঞিকভাবে রাজনৈতিক আনুগত্যের ধব্জা উডিয়ে ভুল ভাল অশ্লীল শব্দ, হুমকি ধামকি এবং বাক্যবানে জর্জরিত করেছে , তাতে বিস্মিত হতে হয় , তার বা তাদের ক্ষমতার উৎস কি ?কিংবা তাদের কি প্রকৃতই শিষ্টাচার আদব কায়দা শিখানো হয়েছে , যেটি আমলাতন্ত্রের প্রাথমিক পাঠ? যদিও এ আচরন একজন ব্যক্তি বিশেষের এবং ব্যক্তিগতভাবে ধর্তব্যের বিষয় নয় , তদুপরি এটি হতাশ করে তার পেশাগত কমিটমেন্ট কিংবা শিক্ষা নিয়ে ।একটি দেশের সরকার ব্যবস্হা পরিবর্তনশীল এবং চলমান আর আমলারা হচ্ছে জনগনের সেবক , তাদের দায়িত্ব হলো সরকারের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা , নিজেদের প্রকাশ্য বির্তক থেকে দূরে রাখা । যদিও রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে অসুবিধা নেই ।কিন্তু এ ধরনের কতিপয় কর্মচারীর উচ্চাভিলাষী এবং অতি উত্সাহী কর্মকান্ড সময়ে সময়ে সকল সরকারকেই বিপদগ্রস্ত করেছে কারন আখেরে রাজনীতিবিদরাই জনগনের কাছে ফিরে যেতে হয় তাদের কর্মকান্ডের জন্য , কোন সরকারী কর্মচারী নয় ।

করোনার এই মহা দূযোগ আবারও প্রমান করলো ব্যর্থতা সফলতার দ্বায়ভার কেবলই রাজনীতিবিদদের । প্রত্যাশা সকল রাজনীতিবিদরা এ বিষয়ে একমত হবেন এবং অতি উৎসাহীদের নিয়ন্রন করবেন । যেখানে রাজনীতিবিদদের সফলতা কিংবা ব্যর্থতা যাচাইয়ের পরীক্ষা হয় জনগনের দ্বারা , সেখানে তোষনপ্রিয় কর্মকর্তা কর্মচারীরা তাদের কিছু দিতে পারে না , ভোগান্তি কিংবা রাজনৈনিতক জীবনের নির্মম পরিসমাপ্তি ছাড়া । এদের লাই দিয়ে মাথায় উঠালে , সরকারের ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ন করে দিবে জনগন পোহাবে দূর্ভোগ , এটি একাধিকবার প্রমানিত হয়েছে সুতরাং গবেষনার কিছুই নাই । করোনার এ ভয়াবহ বির্পযয় যেখানে সরকার এবং রাজনীতিবিদের জনগনের সামনে দলমত নির্বিশেষে তাদের সক্ষমতা এবং অস্তিত্ব নিয়ে চরম প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে , সেখান থেকে রাজনীতিবিদগন যদি ইতিবাচক সিদ্বান্ত নিয়ে আমলাতন্ন্রের এ অপসংস্কৃতি চোরাবালি থেকে বের হতে না পারে , তবে বলতেই হবে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করবেন না । পৃথিবীর সকল দূর্যোগ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মানুষকে ইতিবাচক পরিবর্তনের শিক্ষা দেয় বা সূচনা করে , আমাদের পরিবর্তন ইতিবাচক হবে কিনা সেটাই ভবিষ্যতে দেখার বিষয় এবং অবশ্যই পরবর্তী প্রজম্ম এর বিচার করবে ।

শেয়ার করুন