করোনার ভয়াবহতা সামাজিক জীবনে কি প্রভাব তৈরী করবে ?

প্রকাশিত

নাজমুল করিম : ক’দিন আগে একটা লিখা লিখেছিলাম , করোনা কি বিশ্ব ভূ – রাজনীতির মানচিত্রে পরিবর্তন ঘটিয়ে দেবে ? গত কয়েক দিনে আমেরিকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীতে দৃষ্টিপাত করলে এ বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যাবে ।

আমেরিকায় সংঘটিত পুলিশ কর্মকতার ঘটনাটি একেবারে নূতন নয়। এ ধরনের দু:খজনক ঘটনা ইতিপুর্ব ও সংঘটিত হয়েছে কিন্তু বিস্ফোরণ ওভাবে ঘটেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা সারা আমেরিকায় ভয়াবহভাবে ছডিয়ে পড়েছে, এমনকি ওয়াশিংটনে বিক্ষোভ কালে ট্রাম্পের নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে বাংকারে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে।

শাসকদের মনোবল এতটা তলানীতে ঠেকেছে যে, বিশ্বের সবচাইতে সুরক্ষিত হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা ভীত সন্তস্ত্র হয়ে পড়েছে। আসলে এটিই বাস্তবতা। এটি কোন রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। স্রেফ সামাজিক আন্দোলন। যেখানে মানুষের মধ্যে কাজ করছে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ।

গত পাঁচ মাসের স্তব্দ অর্থনীতি, অপ্রতুল চিকিত্সা ব্যবস্হা, মৃত্যু, ক্ষুধা, বেকারত্ব ইত্যাদি অনিশ্চয়তা মানুষকে নৈরাশ্য এবং নৈরাজ্যকরতার দিকে ধাবিত করছে। ফলে আমেরিকার মতো শক্তিশালী অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা অনেক বেশী সুরক্ষিত সেখানে আজকে নড়বরে অবস্হায় পতিত হয়েছে। আর আমাদের মতো দেশগুলোত যেখানে সামাজিক সুরক্ষার কোন বালাই নেই, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বক্তৃতার মাঝেই সীমাবদ্ধ সেখানে আরো ভয়াবহ চিত্র হতে পারে ।

অন্যদিকে আমরা যদি আমাদের ব্যক্তি জীবনের দিকে তাকাই, করোনা আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। মানুষ করোনার নামে আজ তার অতি আপনজনকে ও রাস্তায় ফেলে আসতে দ্বিধা করছে না। প্রত্যেকেই শুধু নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় ব্যস্ত।

মায়া মমতা, আত্মার বদ্ধন ভালোবাসার এ পৃথিবী হটাৎ করে বদলে গেলো। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মানুষকে selfish বানিয়ে দিচ্ছে। অসুস্হতায় সাহচর্যের এবং মৃত্যু পরবতী শেষ যাত্রায় আপনজনের শেষ বিদায় জানানোর যে চিরায়ত বিধান তার থেকে বণ্চিত হবার নির্মম মনোবেদনা মানুষকে করে তুলেছে আতংকিত।

করোনা থেকে সুস্হ হওয়া মানুষগুলোকে হযতোবা করবে প্রতিশোধ পরায়ন, কারন এ সমাজ কিংবা আত্মার আত্বীয়রা বিপদে মুখ ঘুরিয়েছে, এটি এক অন্য ধরনের মানষিক কষ্ট কিংবা ট্রমা।

অন্যদিকে ক্ষুধা, দারিদ্র , অনিশ্চয়তার ভবিষ্যত – হতাশা মানুষকে ব্যাপকভাবে নৈরাশ্যের দিকে ধাবিত করছে। ফলে প্রতিবাদের সাথে শুরু হয়েছে লুটতরাজ। করোনার সময়কালের হিসাব চীনের জন্য ৫ মাস। বাকী পৃথিবী এর ভয়ানক রুপ দেখেছে মাত্র ৩ মাস। এ ৩ মাসের ধাক্কায় ব্যক্তি থেকে পরিবার, রাষ্ট্র থেকে বিশ্ব সব কিছু নিয়ন্ত্রনহারা হয়ে পড়েছে। এটি যদি আর ৩ মাস গড়ায়, চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন, সরকারী – বেসরকারী সকল মেসিনারিজ অন্তত বিকল হয়ে পড়ার ব্যাপক সম্ভবনা। তাতে বাড়বে অস্হিরতা, বিক্ষুব্ধতা ।

আইন শৃংখলার দায়িত্বে নিয়োজিতরা বিশ্বব্যাপী পরিশ্রান্ত এবং দলে দলে অসুস্হ হয়ে পড়ছে, ফলে শৃংখলার ‘চেইন অব কমান্ড’ দারুনভাবে বিপর্যস্ত।

দুনিয়াব্যাপী সরকার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দু:সময়ে জনগনের পাশে ঐক্যবদ্ধভাবে না দাডিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষদাগার করছে। দেশে দেশে সরকারগুলো তাদের ব্যর্থতা লুকাতে এবং জনগনের দৃষ্টি সরাতে যুদ্ধ ইত্যাদির হুমকি দিচ্ছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব পরিস্হিতি প্রতিদিনই পাল্টে যাচ্ছে।

মানুষের মনোজগতে যে বিশাল ট্রমার সৃষ্টি হচ্ছে , এটি মানুষকে করবে বেপরোয়া, অমানবিক। পৃথিবীতে বহু মহামারী কিংবা দূযোগ এসেছে, তবে এবারকার করোনা দূযোগ ভিন্ন মাত্রার যোগ করেছে , যা মানবসভ্যতার কাছে প্রত্যাশিত নয়। ‘মানুষ সমাজবদ্ধ জীব ‘কিংবা ‘মানুষ মানুষের জন্য ‘ যে সব গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ শুনেছি যুগযুগান্তরে এবং চর্চিত হয়েছে মানব সমাজে, তা হুমকি কিংবা হারিয়ে যেতে বসেছে। নূতন এই পৃথিবী কিংবা এর মানব সমাজের কি চারিত্রিক আচরন হবে তা বলা মুসকিল।

এটি হয়তো একটি ভয়াবহ অবিশ্বাস, অস্হিরতা, অমানবিকতা তৈরী করবে বলে মনে হয়। ট্রমার দীর্ঘ মেয়াধী চিকিত্সা ছাড়া সহজে কাটে না। অশান্ত পৃথিবীতে কে দিবে সে শান্তির পরশ? বিশ্ব ব্যাপী মনোবিজ্ঞানীরা এ নিয়ে চিন্তিত এবং কাজ করছে।

হয়তো উন্নত বিশ্বের জনগন এর চিকিত্সা পাবে, কিন্তু আমাদের মতো প্রকৃত অভিভাবকহীন রাষ্ট্রে কি হবে? তবে সকল অমজ্ঞল কাটিয়ে, সুন্দরতম পৃথিবীর অধিবাসী হই এটাই আমাদের প্রত্যাশা। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে এটিই আমাদের কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা।

লেখক : কলামিস্ট ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

শেয়ার করুন