করোনার আড়ালে জঘন্য রাজনীতি -পর্ব- ০৩

প্রকাশিত

মাকসুদা সুলতানা ঐক্য : আমি বিগত ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টেলিভিশনের জন্য “স্বাস্থ্যসেবা” নামের একটি নিয়মিত ডকুমেন্টারি প্রোগ্রাম নির্মান করেছি বিধায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছু ব্যাপার খুব কাছে থেকে জানার চেষ্টা করেছি।

যেহেতু আমার কর্মক্ষেত্র টেলিভিশন কেন্দ্রীক তাই আমার সামনে যখন ঐ মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিরা কথা বলতেন তখন তারা নিস্পাপ নিস্কলুষ ভাব নিয়ে কথা বললেও তার আড়ালে উক্ত মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগেই বেশ কিছু ভালো কাজের পাশাপাশি যে দুর্নীতির মহোৎসব চলেছিলো সেটা আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলাম।

এবং সে কারণেই যখন করোনা আড়ালের জঘন্য রাজনীতির পর্ব লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং এসময়ের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের ভুমিকা নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি জনগণের মধ্যে যে, ঘৃণা এবং অশ্রদ্ধা দেখতে পাচ্ছি তাই অনেকটা বাধ্য হয়েছি মানুষের মধ্যকার কিছু ভুল ধারণার সংশোধন করতে।

আর হ্যা আগেই বলে রাখছি এই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে লিখতে গেলে এক পর্বে লিখলে সবাই এতো লেখা একসাথে পড়তে গিয়ে বিরক্ত হবে বিধায় এটা দুই পর্বে লিখবো। যাতে সবাই মোটামুটি মনোযোগ অক্ষুণ্ণ রেখেই পড়ে জানতে পারেন।

যা বলছিলাম, আমরা সবাই জানি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাহিদ মালেক, কিন্তু অনেকেই জানিনা যে, এই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের বিভাগের সম্পর্কে। জানিনা এই মন্ত্রীকে এক সাথে কতোটি বিভাগ সামাল দিতে হয়। না কেউ ভুল করেও ভাববেন না যে,আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রীর স্বপক্ষে কথা বলতে চাচ্ছি তা কিন্তু মোটেই সত্যি নয়। মূল কথায় যাওয়ার আগে চলুন জেনে নেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের সঠিক তথ্যগুলো।

মূলত মোট দু’টি বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়। তার মধ্যে একটি হচ্ছে *স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
এবং দ্বিতীয় টি হচ্ছে *স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যান বিভাগ।

এবং এই দু’বিভাগের অধিনে রয়েছে আলাদা আলাদা ইউনিট/অনুবিভাগ/ শাখা/ অনুশাখা। সেই আলাদা বিভাগ সম্পর্কে যাওয়ার আগে বলছি যে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যান নামের দু’টি বিভাগের রয়েছে চরম দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীদের দল।

এবং এই দু’বিভাগের দূর্নীতির মূল উৎস কিন্তু একই ইউনিট / অনুবিভাগ/ শাখা/ অনুশাখা গুলোতে।

মূলত দূর্নীতির উৎস গুলো হলোঃ ক্রয়, সেবা, নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, ইকুইপমেন্টের ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহ, রোগী ভর্তি, টেন্ডার ইত্যাদি। স্বাস্থ্য খাতের ইনজেকশনের সিরিঞ্জ থেকে অপারেশন থিয়েটারের বৃহৎ যন্ত্রপাতি- সব ধরনের কেনাকাটায় ব্যাপক হারে দুর্নীতি সংঘটিত হয়।

এ ক্ষেত্রে টেন্ডার প্রক্রিয়া, দরপত্র আহ্বান, দরদাতা কোম্পানি নির্দিষ্টকরণ ও চূড়ান্তকরণে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়। এ ছাড়া ডাক্তারদের বদলি এবং মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা পিয়ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও কয়েক ঘাটে দুর্নীতি সংঘটিত হয়। এর সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও একশ্রেণির শক্তিশালী দালাল জড়িত।

হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহের ক্ষেত্রেও ব্যাপক হারে দুর্নীতি হয়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন নতুন মেশিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি কিনে তা ইচ্ছা করে বসিয়ে রেখে নষ্ট করা হয়। পরে তা নষ্ট বা ব্যবহারের অনুপযোগী দেখিয়ে আবার নতুন করে কেনার দরপত্র আহ্বান করে নিজেদের পছন্দের কোম্পানিকে সরবরাহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটি গুলোকে প্রভাবিত করা হয় নানাভাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে স্থানীয় দালালদের সমন্বয়ে সংঘবদ্ধ একটি চক্রে পরিণত হয়।

রোগী বা তাদের স্বজনদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে বেআইনিভাবে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করে। নির্ধারিত ফি ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে ঝামেলা এড়িয়ে দ্রুত সেবা পাওয়ার আশায় রোগীরা অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালের কর্মচারী বা দালালদের শরণাপন্ন হন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ক্রয় কমিটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নিরপেক্ষ ও দক্ষ কর্মকর্তা না থাকায় সহজেই সরকারি টাকা আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

ক্রয় কমিটির কার্যক্রমে সরকারের যথাযথ নজরদারি না থাকায় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য পণ্য ক্রয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে অনেক অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হয়।

এক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঁতাত করে সরকারি টাকা ভাগ-ভাটোয়ারা হয়। উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন হাসপাতালে দক্ষ জনবল নিয়োগ না দিয়েই মেডিকেল যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়, যা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হয়ে যায়। কোথাও কোথাও যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও মেরামত দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে সরবরাহ বা মেরামত না করেই টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

চলবে….

১৯ এপ্রিল ২০২০

(বিস্তারিত জানতে হলে পরের পর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, তবে হ্যা এটুকু হলো সূচনা মাত্র। মূল তথ্য সেখানেই পাবেন কে কোথায় কি করছে)

শেয়ার করুন