করোনার আড়ালের জঘন্য রাজনীতি -পর্ব- ০৪

প্রকাশিত

মাকসুদা সুলতানা ঐক্য : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যারা বর্তমানে বড় পদ গুলো দখল করে বসে আছে। মূলত তারা অনেক বছর ধরে একই মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ইউনিট বা অনুবিভাগে কাজ করার সুবাদে উক্ত মন্ত্রণালয়ের খুটিনাটি সব তাদের নখদর্পনে। আর সেই সুযোগে কোথায় কি ভাবে কোন রকম ঝামেলা ছাড়া দেদারসে দূর্নীতি করে পার পেয়ে যায় সেটাও তাদের মুখস্থ। বছরের পর বছর এ সেক্টরের দূর্নীতিতে তারা সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেছে।

এবং শুধুমাত্র এই এক মন্ত্রণালয়ের ঘুরে ফিরে চাকরি করা কর্মকর্তাদের কারণে সেখানে সকল সেক্টরে একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও তৈরী হয়েছে অনেক বছর থেকে। ধরুন আপনি সেই সিন্ডিকেটের কেউ নন, কিন্তু আপনার কোন নিদিষ্ট ব্যবসা রয়েছে এখন খবর পেলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আপনার পণ্যের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে, তখন আপনার সকল ধরনের চাহিদা পুরনের চেয়ে বেশী যোগ্যতা বা সর্বনিম্ন দর দেখিয়ে দিলেও সেখানে আপনি ঢুকতে পারবেন না।

কারণ আপনি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ী নন। আর যদি কোন কারণে ধরুন ওরা সর্বনিম্ন রেট বলে আপনার টেন্ডার পাস করতে বাধ্য হলো, তখন আপনাকে ফোন করা হবে ওদের সাথে একটা সমঝোতা করে নেয়ার জন্য। এবং এতে আপনার কোন লাভ নয় উল্টো নিজের চালান শুদ্ধ হারানোর চান্স থাকবে। এতো কিছু ভেবে চিন্তে যদি ওদের প্রস্তাবে আপনি রাজী না হন তবে কালবিলম্ব না করে আপনার কোথাও কোন ত্রুটি না থাকলেও ওদের ফ্রেমে ফেলে কোন না কোন ত্রুটি বের করে সাথে সাথে আপনি সর্বনিম্ন দরদাতা হন আর যতো যোগ্যই হন এবার আপনি বাদ মানে আপনি সরকারি ভাবে অযোগ্য ।

টেন্ডার পাবে দ্বিতীয় জন এবং সেটা খোদ ঐ সিন্ডিকেট এর লোক এটা শতভাগ নিশ্চিত থাকুন। এবার ধরুন আপনি উচ্চবাচ্য করবেন! কার কাছে নালিশ দেবেন, সে নিজেই তো আপনাকে অযোগ্য বানানোর পেপারে সাইন দিয়ে বসে আছে। বর্তমানে স্বাস্হ্য অধিদপ্তরের সিন্ডিকেট ক্যাসিনো বা ইয়াবা ব্যাবসায়ীদের চেয়েও ভয়ংকর পর্যায় পৌছেছে।

এবং পরপর দু’বার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একবার প্রতিমন্ত্রী পরে ফুল মন্ত্রী নিজের বাবাকে হতে দেখে মন্ত্রী পুত্রের স্বাদ হয়েছে এখানেই তার ব্যবসা করতে হবে। বিগত বছর গুলোতে এই খাতের একজন নার্স, ওয়ার্ডবয় থেকে শুরু করে ডিজির বাসার সুইপারের ও যখন ৮/১০ তলা ফ্লাট বাড়ির মালিক হয়ে গেছে! তাহলে এর চেয়ে সেফ জোনে বিজনেস করার লোভটা সামাল দেয়াও তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়!

যে ভাবনা সে কাজ পুত্র ও নেমে গেলো সাপ্লাই বিজনেসে! কিন্তু এই সাপ্লাই চেইনের মাথায় যে আরো হোমরাচোমরারা বসে আছে তারা শুধু আওয়ামিলীগ আমালের বিজনেসম্যান নয় এরশাদ এবং বিএনপি জামাত জোটের আমলেও তাদের অধিপত্য ছিলো অন্যদিকে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও সেই আমলেও বহাল তবিয়তে ছিলো।

বছর বছর সরকারি নিয়মে প্রমোশন নিয়ে বড় থেকে বড় পদ পেয়েছে। তবে হ্যা যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে এই কর্মকর্তারা চুরিচামারি করলেও অনেক ভালো কাজও করে অন্তত সরকারকে দেখিয়েছে তা না হলে সরকার ই বা প্রমোশন দিয়ে আরো বড় পদে বসাবে কেন!

আর তাদের এতো বছরের প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে মন্ত্রী পূত্রের বড়াই তারা সইবে ক’দিন তাই শুরু হয়ে গেলো গুপ্তযুদ্ধ। মন্ত্রী ও পুত্র যে একবারে সাধু তাও কিন্তু নয় মোটামুটি সেও বেশ বড় অংকের টাকা কামিয়ে নিয়েছিলো ইতোমধ্যে। তারপর আসল মাফিয়ারাই তার নামে কোন না কোন ভাবে দুদকে কমপ্লেন করে দিলো। এবার দুদক একেএকে কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপের আস্তানা পেয়ে উক্ত মন্ত্রণালয়ের সকল বিভাগের দূর্নীতির মহোৎসব দেখে আইনি পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে দিলো। এখানে কে মন্ত্রী পুত্র বা মন্ত্রীর পিএস সেটা দুদকের দেখার সময় নেই তখন দুদক তাদের নানাভাবে তদন্ত করে জেরা করা শুরু করলো। মাঝখানে বছর ২ আগে ১৭ /১৮ জন দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তার শাস্তি ও দেয়া হয়েছিলো দুদকের তদন্তের ফলে। কিন্তু ঐ ১৭/১৮ না হয় বোকা গাধা ছিলো বলে প্রমাণ রেখে দূর্নীতি করে ধরা পরেছে! কিন্তু এখনো যারা আছে তারা তো আর গাধা নয় এরা শেয়াল তাই কোন ফাঁক রাখেনা দুদকের চোখে ধরা পরার। মন্ত্রী পূত্র ও বোকা গাধা বিধায় এখানেও ফাঁক আছে তাই আর যাবে কোথায়? যথারীতি মন্ত্রী পূত্র ধরা পরে গেলো,যার ফলশ্রুতিতে মন্ত্রীও তার ছেলেকে ঐ সেক্টরের ব্যবসা থেকে বাদ দিয়ে দিলো।

অন্যদিকে যারা আগে থেকে আদী সিন্ডিকেটের হোতা তাদের সাথে মন্ত্রী পূত্রের হাম বড়া মিঞা ভাবের জন্য মন্ত্রী পরে গেলো রোষানলে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আর মন্ত্রীর সাথে এই করোনা মহামারীর সময়ে সেটা পাবলিকলি প্রকাশ হতে শুরু করলো। লাইভে এসে নিজের মুখেই জানিয়ে দিলো যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসহযোগিতা কারণে তার তথ্য বিভ্রাট হচ্ছে। এবং আমরা প্রায় সবাই ই দেখেছি যে, অধিদপ্তর থেকে করোনা সংক্রান্ত যে রিপোর্ট তাকে পাঠানো হয় এবং যা মন্ত্রী ক্যামেরার সামনে লাইভে পড়ে শোনায় তা কতো ভুলে ভরা রিপোর্ট।

এদিকে বাংলাদেশের কিছু ঘৃণ্য গোষ্ঠীর লোকেরা সেই বক্তব্য গুলোকে ফেসবুকে অর্থের বিনিময়ে বুস্টাপ করিয়ে ভাইরাল করে প্রচার দিয়ে মন্ত্রী সহ সরকারের গুষ্টি উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে থাকছে। অথচ এই সকল অপকর্ম এবং ঘৃণ্য গোষ্ঠীর দোসরেরা যে সিন্ডিকেট সহ অধিদপ্তরের বড় কর্তা হয়ে বসে আছে সাধারণ মানুষ মানে আমরা সেটা অনেকেই না বুঝে ঐ গোষ্ঠীর ভাইরাল করা পোস্টের শেয়ার করে মন্ত্রী কে অথর্ব, অযোগ্য, ফালতু, কানা, মূর্খ, মিথ্যুক, পদত্যাগ চাই হেন চাই তেন চাই বলে গালি দিয়ে বেড়াচ্ছি।

অন্যদিকে সিন্ডিকেট মাফিয়াদের বড় ব্যবসায়ী লোকটি সার্জিক্যাল সমিতির লোকদের সাথে নিয়ে সিন্ডিকেট করে চায়না থেকে কম দামে নিম্ন মানের মেডিক্যাল পণ্য বাংলাদেশে এনে নিজের ফ্যাক্টরীতে তাঁর কোম্পানির নামে প্রস্তুতকারক দেখিয়ে প্যাকেট করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করে চলছে বছরের পর বছর থেকে।

ঐ মাফিয়া ব্যবসায়ী আবার সিন্ডিকেটের লোক ছাড়া অন্য কোন ব্যবসায়ীকে তার আনা পণ্য দেয় না, এতে করে সিন্ডিকেটের লোকেরা বেশি দামে বিক্রি করতে পারে তারাও লাভ পায় সেও একক ভাবে ব্যবসা করে। এভাবে ঐ চক্রের হোতা বছরের পর বছর একক অধিপত্যে প্রতিদ্বন্দ্বী বিহীন ভাবে দূর্নীতি করে চলছে।

এবং যদি অন্য কেউ ঐ পন্য অন্য বা কোন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভালো দেশ থেকে বা আরো ভালো মানের আনাতে গেলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ডিজির এর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা দেখিয়ে সেই আমদানীকারক কে আনতে বাধা দেয়া হয়। আবার
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ডিজিকে দেখায় যে, ঐ একই পণ্য পর্যাপ্ত পরিমান বাংলাদেশে উৎপাদন হচ্ছে তাই এই আইটেম যেনো বিদেশ থেকে আমদানি করা না হয়। এবং ডিজির স্বাক্ষরিত নিষেধাজ্ঞা জারী করে দেশের সকল পোর্টেও পাঠিয়ে দেয়, যাতে অন্য কেউ কোন ভাবে নির্ধারিত পণ্য অন্য কোন দেশ থেকে আমদানি করে এনে বাংলাদেশে ঢুকাতে না পারে ।

এদিকে বর্তমান করোনা মহামারীর সময়ে চীন থেকে যে সব করোনা টেটিং কিট সহ অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রীগুলো অনুদান হিসেবে আসছে, সে গুলোকেও ঐ সিন্ডিকেট এবং অধিদপ্তর/ মন্ত্রণালয়ের সেই চিহ্নিত কর্মকর্তা, কর্মচারী সমন্বয়ের গঠিত মাফিয়া চক্রের সহযোগিতায় সরকারি কাজে ব্যবহার না করতে দিয়ে বিভিন্ন পন্থায় সরিয়ে দিয়ে কৃত্তিম সংকট তৈরী করে সরকার বিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়েছে। সেটা ই এখন ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্থানে র‍্যাবের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসতে শুরু করেছে। শুরুতেই বলেছিলাম জঘন্য চতূর্মূখী রাজনীতি চলছে এসব তারই নমূনা মাত্র….

চলবে…..

মাকসুদা সুলতানা ঐক্য
২২ এপ্রিল ২০২০

(সরি….ভেবেছিলাম স্বাস্থ্যের দূর্নীতি ২ পার্ট এ লিখে শেষ করতে পারবো। এখন তো ৩ এ ও শেষ হলোনা। কিন্তু সত্যিটা হলো এই সেক্টরে এতো বেশী দূর্নীতি এবং এটার চরিত্র ও করোনার মতো তাই ঠিক বলতে পারছি না আর কতো পর্ব বাড়াতে হবে)

শেয়ার করুন