করোনাকালীন কোরবানী নিয়ে চারিদিকে দুশ্চিন্তা

প্রকাশিত

মুক্তমন রিপোর্ট : সর্বাগ্রাসি করোনার মধ্যেই ঘনিয়ে আসছে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা। ঈদের দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে পশু কোরবানী নিয়ে ততোই বাড়ছে অনিশ্চয়তা। স্বাভাবিক কারণে দুশ্চিন্তা দানা বাঁধছে কোরবানীদাতা এবং খামারিদের মাঝে। বিশেষ করে সারা বছর যারা সর্বস্ব বিনিয়োগ করে পশু লালন-পালন করেছেন, নিজেরা খেয়ে না খেয়ে গৃহপালিত পশুকে খাইয়েছেন তাদের চোখে মুখে আজ রাজ্যের অনিশ্চয়তা, মাথায় ভর করেছে দুশ্চিন্তার পাহাড়। কোরবানীদাতারা আদৌ কোরবানী করতে পারবেন কী-না, হাট-বাজারগুলো আগের মতো মিলবে কী-না, নিজের লালন পালন করা পশুগুলো শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে পারবেন কী-না, বিক্রি করতে পারলেও উপযুক্ত মূল্য পাবেন কী-না এজাতীয় হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে খামারীদের মনে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি খামারি গরু মোটাতাজা করে থাকেন। কোরবানির প্রাণি হিসাবে বিক্রি করার জন্য গত বছর সারা দেশে অন্তত এক কোটি আঠারো লাখ প্রাণি লালন-পালন করা হয়েছিল। এখনো পর্যন্ত সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেওে চলতি বছরও সংখ্যাটি এর কাছাকাছি হওয়ার কথা। কিন্তু বিক্রির যে পরিস্থিতি তাতে এবছর অর্ধেক প্রাণীই অবিক্রিত থেকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিঙ্গাপুর থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে দেশে এসে গরুর খামার করেছেন উদ্যেমী তরুণ মোহাম্মদ আলী শাহীন। রাজধানী ঢাকার আশপাশে রয়েছে তাদের ১৮টি গরুর খামার। করোনার কারণে তাদের পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে জানিয়ে মেঘডুবি এগ্রো নামক খামারের এ মালিক।

এদিকে রাজধানীসহ সারাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণরোধে আসন্ন ঈদ-উল-আযহায় সীমিত পরিসরে কোরবানীর পশুর হাট বসবে বলে ঘোষনা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সকল প্রতিষ্ঠান এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে তাদের এলাকার বাস্তবতার আলোকে সীমিত পরিসরে কোরবানীর পশুর হাট ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অনলাইনে কোরবানীর পশু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য সবার প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, কোরবানীর পশুর হাটে লোক সমাগমের সম্ভাবনা বেশি থাকে। এতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কাও বেশি।

মন্ত্রীর ঘোষনার বাস্তবায়ন দেখা যায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সিদ্ধান্তেও। স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে এবছর দুই সিটিতে হাট বসবে মোট ১২টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল তিন গুনেরও বেশি। অবশ্য এর আগে মোট ২৭টি হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে দক্ষিণে ১৫টি এবং উত্তর সিটিতে ১২টি। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে দুই সিটি করপোরেশন। উত্তর সিটি অস্থায়ী ছয়টি হাট দরপত্র আহ্বান করেও শহরের ভেতরে হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাতিল করেছে। একইভাবে দক্ষিণ সিটিও ৮টি হাট না বসানোর ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

হাটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং করোনাজনিত স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিয়ে কড়াকড়ির কারণে এবছর টাকার বন্দোবস্ত হলেও পশু কিনতে পারবেন কী-না সন্দেহ খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আমিনুল হকের। তিনি বলেন, এমনিতেই আয়-রোজগার নেই। তার ওপর করোনার কারণে এবার হাটে যেতে পারি কী-না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রতি বছর একাই একটি গরু কোরবানী করে আসছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এবার যদি উপযুক্ত শরীকদার পাই তবে কোরবানী দেবো, নইলে দেবেই না। উপযুক্ত শরীকদারের ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আমি হাটে যেতে পারবো না। শরীকদার যদি কিনে আনতে পারে তবে আমি আমার ভাগের টাকাটা দেওয়ার চেষ্টা করবো।

আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে প্রাণিসম্পদ খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গরু ও গাভী পালন থেকে কৃষকদের আয় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে এবং ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমেছে ৪২ শতাংশ। গবেষনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোষা প্রাণির খাবারের স্বল্পতা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক খামারিরা গবাদিপশুদের খাওয়ানো কমিয়ে দিয়েছেন, যা প্রাণিসম্পদের সঠিক বেড়ে ওঠায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

কোভিড-১৯ প্রভাব ফেলেছে প্রাণিসম্পদ খাতে ঋণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়ের ওপরও। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী জুনের শেষ অবধি ঋণের কিস্তি শিথিল করা হয়েছে, অর্থাৎ জুন পর্যন্ত ঋণগ্রহীতা কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে সেটিকে খেলাপি বা বিরূপমানে শ্রেণিকরণ করা যাবে না। দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের একটি বঙ অংশ হলো গবাদিপশুর খামারিদের জন্য ঋণ। এই সল্পমেয়াদি ঋণগুলো সাধারণত গবাদিপশু বিক্রির পরে পরিশোধ করতে হয়। আসন্ন কোরবানি ঈদে খামারিদের গরু বিক্রি নিয়ে যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে তার পাশাপাশি এখন ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ার করুন