এতো নকলের ভীড়ে আসল জিনিস খুঁজে বেড়াই কেবল

প্রকাশিত

রাকিব হাসান রাফি : আমাদের দেশের মানুষের অবস্থা এখন এমন একটি জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে আমাদের মধ্যে “ইনস্টিটিউশন” এ শব্দটি একেবারে ভেঙে পড়েছে। এটা ঠিক বাংলাদেশে এখনও অনেক প্রতিভাবান ও পরিশ্রমী মানুষ রয়েছেন যারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজেদের সাফল্যের প্রমাণ রেখেছেন কিন্তু ইনস্টিটিউশন হিসেবে আমাদের দেশে যে ধরণের কর্মতৎপরতা থাকার দরকার তা আর চোখে ধরা দিচ্ছে না। এর একটি বড় প্রমাণ আমাদের স্বাস্থ্যখাত। করোনা বিপর্যয় আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুরতাকে বারবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। আবার ইদানিং যেহেতু একেবারে ক্ষুদ্র পরিসরে সাংবাদকিতা করি শখের বশে তাই ইউরোপের সাংবাদিকতার এখন যে হালচিত্র সেটা দেখলে কেনও জানি বুকের ভেতর ধক করে উঠে।

এইতো সেদিনের কথা। আমাদের স্লোভেনিয়ার পাশের কোনও একটি দেশ, আন্তর্জাতিক যে কোনও সূচকে দেশটি বরাবরই শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে পরিগণিত। স্লোভেনিয়াতে বাংলাদেশের কোনও অ্যাম্বাসি নেই এবং যে কোনও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে আমাদেরকে সে দেশের রাজধানী শহরে যাতায়াত করতে হয়। সে দেশেরই এক প্রবাসী বাংলাদেশির সাথে একবার পরিচয় হলো। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হবে। নিজেকে তিনি সাংবাদিক বলে পরিচয় দেন। তিনি না কি আবার জার্নালিজমে ব্যাচেলর ডিগ্রিও সম্পন্ন করেছেন।

আমরা জানি সাংবাদিকেরা হচ্ছে জাতির বিবেক। “প্রমথ চৌধুরী” এ নামটির সাথে পরিচয় নেই এমন কোনও বাঙালি জাতিসত্ত্বার পরিচয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত “সবুজপত্র” পত্রিকাটি বাংলা ভাষা অঙ্গনে এক বিপ্লব সৃষ্টি করেছিলো। তবে এ পত্রিকাটি খুব বেশি দিন সফলতার মুখ দেখে নি, কারণ বাণিজ্যিক স্বার্থে কিংবা আয়ের কোনও উৎস হিসেবে প্রমথ চৌধুরী এ পত্রিকাকে ব্যবহৃত হতে দেন্ নি। অর্থাভাবে এক সময় এ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। আমার কাজী নজরুল ইসলামের কথাও জানি। তিনি “ধূমকেতু” নামক একটি বিশেষ পত্রিকার সম্পাদনা করতেন এবং তাঁর লেখা সে সময় নিখিল ভারতের সকল জাতিসত্ত্বার মানুষের মাঝে বিশেষ এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো যার কারণে তাঁকে ব্রিটিশ সরকার কারাবন্দিও করে। বাংলা সাংবাদিকতা এরকম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে পরিপূর্ণ।

অথচ আমাদের এ তথাকথিত হলুদ কার্ডধারী প্রবাসী ভাই সাংবাদিকতা বোঝেন না কোনও কিছুই। খুবই বিশ্বস্ত এক সূত্র থেকে জানতে পেরেছি নিজেকে তথাকথিত সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে রিপোর্টিং করার কথা বলে তিনি অনেকের থেকে ইউরো আদায়ও করেন। নিজে লেখতে পারে না দুই কলমও, এর মধ্যে যতোটুকু লেখা আবার থাকে বানানে অজস্ত্র ভুল খুঁজে পাওয়া যায়। তার লেখা পড়লে যে কারোর বদহজম হতে বাধ্য।

কথা বলার স্টাইল ভালো এবং কথায় জড়তা নেই। আমি সব সময় স্বীকার করি যে ক্যামেরার সামনে আমি ঠিক মতো কথা বলতে পারি না এবং আমার কথায় জড়তা রয়েছে প্রচুর। উচ্চারণগত সমস্যাও রয়েছে। ক্যামেরার সামনে আমি পুরোপুরি ফিট না এখনও, তাই বলে আমি কিন্তু ফাঁকা বুলি আওড়ানোর মতো কাজ করি না ক্যামেরার সামনে।

আচরণ একেবারে বুনো জানোয়ারদের মতো, তার দাবি তিনি না কি এক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। অথচ আমার মনে হয় না এরকম একটি বিশ্ববরেণ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পাড়ি দেওয়ার মতো যথেষ্ট যোগ্যতা তার রয়েছে। একবার তিনি ধান্দা করেন সাদা চামড়ার কোনও সুদর্শন রমণীর সান্নিধ্য পেতে, আবার মাঝে-মধ্যে ছুটে যান ইতালি, স্পেন, পর্তুগালসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। পায়ের তলায় কারও যদি মাটি না থাকে তাহলে যে অবস্থা হয় আর কি। কখনও কখনও অ্যাসাইলাম পাওয়ার উদ্দেশ্যেও কিছু সস্তা জনপ্রিয়তার লেখা তার ফেসবুকের টাইমলাইনে খুঁজে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে এখনও যারা সত্যিকারের কলমযোদ্ধা রয়েছেন তাঁদের কেউ যদি এরকম হলুদ কার্ডধারীর মুখোমুখি হন তাহলে নির্ঘাত তিনি জণ্ডিসে আক্রান্ত হতে বাধ্য।

এখন বাংলাদেশে দেখি অনেকেই কাছে বিদ্যা কিংবা বুদ্ধি কোনোটি নেই যার মধ্যে সেও থেকে নিজে অনলাইন নিউজ পোর্টাল খুলে সাংবাদিক হয়ে বসে আছেন। ফেসবুকের কল্যাণে কিংবা ইউটিউবের কল্যাণে তিনি তথাকথিত টেলিভিশন চ্যানেলেরও মালিক বনে যাচ্ছেন। ইউরোপ বাংলা ডট কম থেকে আরম্ভ করে কতো যে রকম ডট কম দেখলাম চারিদিকে এতো নকলের ভীড়ে আসল জিনিস খুঁজে বেড়াই কেবল।

আমাদের বাংলাদেশে দরকার হচ্ছে একটি বিপ্লব। আমাদের দেশের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রকে এখন পুনরায় ঢেলে সাজানো প্রয়োজন, পাশাপাশি আমাদের মাঝে যে এখন মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে সেটা নিয়েও কাজ করা জরুরি। না হলে জাতি হিসেবে আমাদের পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ।

লেখক : স্লোভেনিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী শিক্ষার্থী।

শেয়ার করুন