এই একটা ঈদে শপিং না করলে আপনার পরিবারের উপর ঠাডা পরবেনা

প্রকাশিত

মাকসুদা সুলতানা ঐক্য : “হার্ড ইমিউনিটি” শব্দটা শুনেছেন অনেকেই, কিন্তু এটা ঠিক কি ভাবে কোন মহামারী /ভাইরাস সংক্রমণের সময় কাজ করে তা হয়তো সবাই বুঝতে পারছেন না।

তবে চলুন লেখাপড়া করি।

“হার্ড ইমিউনিটি” তত্ত্ব হচ্ছে কোন ভাইরাস বা মহামারী যখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়। বা বলা যেতে পারে যে আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যায় তখন সে দেশ বা সেই জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বশেষ পন্থা।

এই হার্ড ইমিউনিটি সিস্টেম এ চলে গেলে যা হয়। যেমন হার্ড ইমিউনিটি মানব সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশে কোনো রোগের টিকা বা ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলে পুরো মানব সমাজ এর ফল ভোগ করে, অর্থাৎ ঐ রোগটি আর মানুষের দেখা দেয় না।

এই পদ্ধতিটির নাম হার্ড ইমিউনিটি (herd immunity)। সাধারণভাবে কোনো জনগোষ্ঠীর ৮০% মানুষকে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলে (হামের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এটি ৯০%-এর কাছাকাছি) রোগ প্রবাহের চেইনটি ভেঙে যায় এবং ঐ জনগোষ্ঠীর বাকিদের ভ্যাকসিন প্রয়োগ না করলেও তারা রোগটিতে আক্রান্ত হয় না।

হার্ড ইমিউনিটির এই ধারণার ওপর ভিত্তি শুধু ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রেই নয়, কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মাঝে কোনো সংক্রামক রোগ কোনো নির্দিষ্ট ব্যাপ্তিতে ছড়ালে রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর তাদের মাঝে ঐ রোগের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি তৈরি হয়।

এবং এতে করে ঐ জনগোষ্ঠীর যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়নি, তারাও ঐ রোগের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি অর্জন করে এবং এই রোগে আক্রান্ত হয় না।

যুক্তরাজ্যে কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তার দেশে কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব ও লক ডাউনের পরিবর্তে এই হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্বের কথা বলেছিলেন।

সে দেশের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা প্যাট্রিক ভ্যালেন্সও এ কথাকে সমর্থন করে বলেছিলেন- যদি যুক্তরাজ্যের ৬০ শতাংশ মানুষ কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়, তবে সমগ্র যুক্তরাজ্যে এই রোগের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হতে পারে।

কিন্তু এ বিষয়ে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এর অধ্যাপক মার্টিন হিব্বার্ড-এর বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন- “হার্ড ইমিউনিটির এই তত্ত্ব সঠিক হলেও জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশটি এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ইমিউনিটি অর্জন করবে,এই আশার ওপর ভিত্তি করা রোগ প্রতিরোধের খুব ভালো পদ্ধতি নয়’’।

হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হওয়ার যে শর্ত রয়েছে, অর্থাৎ জনগোষ্ঠীর বৃহদংশকে এই রোগে আক্রান্ত হতে হবে, সুস্থ হতে হবে এবং এদের মাঝে যে ইমিউনিটি অর্জিত হবে, সেটি তাবৎ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ইমিউনিটি দেবে- এই শর্ত কি কোভিড-১৯ রোগের ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হবে?

তত্ত্বগতভাবে হার্ড ইমিউনিটি রোগ প্রতিরোধের একটি পদ্ধতি হলেও কোনো রাষ্ট্রেরই এই হার্ড ইমিউনিটির ওপর ভরসা করে থাকা ঠিক হবে না।

কারণ- আমরা এখনও জানি না নতুন করোনা ভাইরাসটি কতো মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে।

পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায় না।

দ্বিতীয়ত, এই ভাইরাসটি যেভাবে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে রূপ পরিবর্তন করছে, তাতে এর একটি রূপ দিয়ে কেউ আক্রান্ত হয়ে ইমিউনিটি অর্জন করলেও তার এই অর্জিত ইমিউনিটি হার্ড ইমিউনিটির ক্ষেত্রে কোনো অবদান রাখবে না, যদি ভাইরাসটির অন্য রূপ দিয়ে কেউ আক্রান্ত হয়।

কোভিড-১৯ মহামারি রুখতে আপাতত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত পরিষ্কার রাখা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনবোধে লকডাউন- এর বিকল্প নেই। একই সাথে প্রতিটি সন্দেহজনক কোভিড-১৯ রোগীর ল্যাবরেটরি পরীক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা সম্ভবত এমন একটি ভাইরাসের সাথে দীর্ঘসময়ের জন্য সহাবস্থান করতে যাচ্ছি, যেটি মহামারির তীব্রতা কমে আসার পর প্রতি বছরই আসবে।

কোভিড – ১৯ এ যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেনে যে ভয়াবহ আকারে মানুষের মৃত্যু ঘটছে, সেটি অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দেশে ঘটবে না- তাও বলা যাচ্ছে না। নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষেধক হয়তো আবিষ্কার হবে, কিন্তু এখন বিশ্বের প্রতিটি নাগরিকের উচিৎ হবে- যতদূর সম্ভব জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলা।

তাই বলছি, বঙ্গবন্ধুর কন্যা বিভিন্ন শ্রেণীর বেনিয়া গোষ্ঠীর চাপে যতোই রাস্তাঘাট, দোকানপাট অথবা শপিংমল সীমিত আকারে বা ব্যপকভাবেই খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত দিক না কেন, এখন আপনি আমি এবং আমরা নিজেরা নিজ দায়িত্বে সচেতন না হলে পৃথিবীর কোন শক্তি নেই যে আমাদের রক্ষা করবে!

ইদানীং যে হারে বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে তাতে থার্ড ইমিউনিটি বাংলাদেশে এসে গেলে আক্রান্ত ঠিকই ৭০%-৮০% নয় ৮৯%-৯৯% ই হবে তবে আমরা সারা জীবন ফরমালিন দেয়া,বাসি,পঁচা,পুষ্ট মানহীন খাবার খাওয়া মানুষ সেই আমাদের শরীর এন্টিবডি বা ইমিউন করবে বলে আমার তো মনে হয়না।

এবার শপিংমল বা মার্কেট খুলছে সেখানে আপনারা আগের মতো প্রাইভেট কার,উবার,সিএনজি, বাইক,রিক্সা কিংবা লোকাল বাসে চড়ে গিয়ে ঈদ শপিং করবেন কিনা সেটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যপার।

তবে সাবধান করছি খবরদার! আপনারা ঈদ শপিং করে মরেন কি বাঁচেন – বেহেস্তে অথবা জাহান্নামে যান, এই ব্যাপার নিয়ে কেউ বঙ্গবন্ধুর কন্যার দিকে ভুল করেও আঙ্গুল তোলার চেষ্টা ও করবেন না। এবং মনে রাখবেন জীবনে এই একটা ঈদে শপিং না করলে আপনি এবং আপনার পরিবারের উপর ঠাডা পরবেনা।

০৬-০৫-২০২০
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন