আবিদের আত্মত্যাগ

প্রকাশিত

লেখক

আত্মত্যাগ

পাঁচদিন যাবৎ হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে আবিদ। বাড়িতে একজন ছাড়া আর কাউকে কিছু জানায়নি,অসুস্থ দাদা, সন্তানসম্ভবা স্ত্রী, বাবা-মা, ছোট বোন। জানে শুধু পিঠাপিঠি কলেজ পড়ুয়া ছোট ভাইটি।

২০১৬ সালে দেশ সেবার ব্রত নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল পদে যোগদান করে।২০১৯ সালের মে মাসে একটি ভালো দিন দেখে পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয় আবিদ আর রেহানার।আবিদ সংসারের বড় ছেলে,অনেক দায়িত্ব তার।দুই ভাই, এক বোন,বাবা-মা আর বৃদ্ধ দাদাকে নিয়ে তাদের সংসার।চাকরি পাওয়ার পর থেকেই দাদার ইচ্ছা বড় নাতিকে বিয়ে করাবে, নাত বউয়ের মুখ দেখবে।বয়স হয়ে গেছে কখন পরপারের ডাক আসে তার ঠিক নাই।বাড়ি সিরাজগঞ্জের বেলকুচির তাঁতপল্লীতে।তাঁতকলের খটাখট শব্দে তাদের ঘুম ভাঙ্গে।

আবিদের বাবা একজন তাঁতী,অভাবের সংসার তাই লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি।এসএসসি পাশ করেই চাকরিতে ঢুকতে হয়েছে,পোস্টিং মুন্সিগঞ্জ।রেহানার বাড়ি আবিদের বাড়ি থেকে মিনিট দশেকের পথ।এসএসসি পাশ করার পর বিয়ে হয়ে যায়। কলেজে ভর্তি হবে কিন্তু এরই মধ্যে গর্ভবতী হয়ে পড়ে।স্বামী খুব বেশি ছুটি পায় না।পুলিশের চাকরি অনেক দায়িত্ব তার। শুক্রবার আর শনিবার নাই তাদের ডিউটি প্রতিদিন। কারণ মানুষের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব পুলিশের। সব জেনেশুনেই বিয়ে করেছে আবিদকে।স্বামী জনগণের সেবায় নিয়োজিত এটাই তার কাছে অনেক কিছু।

মাত্র এক বছর হল বিয়ের, আবিদের মন পড়ে থাকে বাড়িতে। নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা রেহানা।ভেবেছে এবার একটু দেরি করেই বাড়ি যাবে,যেন সন্তানের মুখ দেখতে পারে গিয়ে।প্রথম বাবা হবার অনুভূতি আলাদা।ছেলে বা মেয়ে যা-ই হোক আবিদের মাথা ব্যাথা নেই।সন্তান তো সন্তানই, মা ও শিশু সুস্হ থাকলেই হলো।

কোভিড-১৯ এর কারণে সারাবিশ্বে স্হবিরতা বিরাজ করছে।সবকিছু বন্ধ,মানুষ গৃহবন্দী।এ যেন বিশাল যুদ্ধ এক ভয়াবহ মহামারীর বিরুদ্ধে। করোনার কারণে পুলিশের ছুটি বন্ধ।আবিদের দায়িত্ব পড়েছে মাওয়া ফেরিঘাটে।করোনার কারণে সব বন্ধ হওয়ায় লাখো লাখো মানুষ ছুটছে গ্রামের দিকে।মানুষের নিরাপত্তার জন্য, সবাইকে ঘরে রাখার জন্য যে ছুটি, অবুঝ মানুষ তা না বুঝে ছুটাছুটি করছে,ছুটছে পায়ে হেটে।কারো মধ্যে কোন সচেতনতা নাই।

ডিউটিরত পুলিশেরা হিমশিম খাচ্ছে।এরই মধ্যে এক অল্পবয়সী অন্তসঃত্ত্বা নারী আবিদের সামনে এসে দাঁড়ায়,তার সাহায্য চায়।ভিড়ের মধ্যে সে ফেরিতে উঠতে পারছে না।সেই দুঃস্থ নারীর মুখ দেখে আবিদের রেহানার কথা মনে পড়ল।তার স্ত্রীও যদি এই সমস্যায় পড়ত তাহলে কী হত!! তাই আর কোন কিছু না ভেবে ভিড়ের মধ্যে সেই নারীকে নিয়ে চলে গেল ফেরিতে।প্রচণ্ড ভিড় উপেক্ষা করে ফেরির দোতলা সিঁড়ির কাছে বসিয়ে রেখে হাতে দুইশত টাকা দিয়ে চলে আসল,আর বার বার রেহানার কথা ভেবে ভেবে চোখ ভিজে উঠল।এর এক সপ্তাহ পর আবিদের জ্বর শুরু হয়, হাঁচি-কাশি সেই সাথে বুকে ব্যাথা। বুঝতে বাকি রইল না আর।যে করোনার কারণে সে মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে আসছিল সে করোনায় এখন সে নিজেই আক্রান্ত।

রেহানা হাসপাতালে ভর্তি দুইদিন যাবৎ, খুব অসুস্থ। আবিদ তাকে জানায়নি তার অসুস্থতার কথা।খুব ইচ্ছা ছিল আবিদের সন্তানকে সে প্রথমে কোলে তুলে নিবে।আবিদের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল।ভেন্টিলেশনে রাখার পরও অবস্হার অবনতি হওয়ায় মৃত্যুকে সে বরণ করে নিল।অন্যদিকে আবিদ-রেহানার সংসার আলো করে ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম হলো।আবিদ বলেছিল যদি কন্যাসন্তান হয় তাহলে নাম হবে পূণ্য।পৃথিবী আলো করে সৌভাগ্য নিয়ে আসবে সে।কিন্তু পূণ্যের দুর্ভাগ্য যে বাবার আদর, স্নেহ থেকে চিরতরে বঞ্চিত হলো সে।এক সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে আবিদ নিজের সন্তানকে পিতৃহারা করে দিল।
(গল্পের কাহিনি ও চরিত্র কাল্পনিক)
ফারহানা তানজীম
সহকারী অধ্যাপক
বাংলা,
সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা।

শেয়ার করুন