আতঙ্ক না ভয় !!জয় না পরাজয় !!!

প্রকাশিত

মানিক মুনতাসির : দূষিত নগরী, জাদুর শহর, প্রাণের শহর, ব্যস্ততার শহর, কোলাহল আর জ্যামের শহর এখন বেশ চুপচাপ। রাতের ঢাকা এখন ভুতুরে। এক/দুই/তিন করে শতক পেরিয়েছে মৃতের সংখ্যা । আক্রান্ত বাড়ছে হু হু করে। মনের মধ্যে আতঙ্ক, ভয় এমনভাবে বসেছে। না শুধৃু বসেনি। বাসাই বেঁধেছে। কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের সারিটাও লম্বা হচ্ছে লাশের সাথে। কত মানুষ অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে তার হিসাবটা হয়তো সরকারের কাছে পরিস্কার নয়। কেননা গত ১০/১৫ বছরে প্রবৃিদ্ধ যে বাড়ানো হয়েছে। আর দারিদ্রের সূচকটা যতটা নেমেছে । আবার ১০ বা ১৫ শতাংশ মানুষের আয় বেড়েছে শতগুণ। বাকি ৮৫ শতাংশ মানুষের আয় যে হারে বেড়েছে তাদের খরচ বেড়েছে আরো লাগামহীনভাবে।

ফলে কত মানুষ এখন না খেয়ে কিংবা অর্ধেক খেয়ে বেঁচে আছে বা বাঁচার জন্য যুদ্ধ করছে সে হিসাবটা অন্তত সরকারের খাতায় তুলতে আরো সময়ের প্রয়োজন। অবশ্য সরকার যে ১০ টাকা কেজিতে চাল দেয়ার কর্মসূচি নিয়েছে সেটার সদ্ব্যবহার হলে অনেকটা কার্যকর হতো। ক্ষুধার্ত মানুষের জীবন সহজ হত। কিন্তু চাল চোরেরা তা হতে দেয়নি।

ঘটনা-১: আমারা এক পরিচিত কলা বিক্রেতা । বাড়ি জামালপুর। সে অতটা সিরিয়াস না ভেবে গ্রামে যায়নি। এখন অর্ধাহারের বন্দিজীবন কাটাচ্ছে। দিন ১৫ আগে কিছু চাল, ডাল নগদ টাকা দিয়েছিলাম। আজ সে আবার বাড়ির সামনে এসে দারেয়ানের মাধ্যমে আমাকে খুঁজছে । আমি জানতে পেরে নিচে নেমে সাধ্যমত চেষ্টা করলাম সহায়তার। কিন্তু কতদিন আর এভাবে। যেহেতু সে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নয় ফলে সরকারি কোন সহায়তা সে পাচ্ছে না। এমন কতজন নাম না জানা কলা, আপেল, সবজি, চানাচুর বিক্রেতা আছে। তার হিসাব কে রাখে ব্যস্ত জীবনে।

ঘটনা-২: গত রাত সাড়ে তিনটা, কি একটা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। এমনিতেই গত দু,মাস তেমন ঘুম হয় না। আমি প্রায় ৫ বছর যাবৎ অ্যাজমা রোগী। গত ১৫ দিন ধরে শ্বাসকষ্ট । দিনের সকালটা বেশ কষ্ট হয়। তারপরও দৈনন্দিন কাজ, অফিসের রুটিন কাজ করে যেতে হচ্ছে । অবশ্য গত প্রায় ১০ দিন বাসায় বসে অফিসের সব কাজই করছি। এমন অজানা আতঙ্ক সারাক্ষণ। অজানা নয় অবশ্য জানাই । সবকিছুতেই খালি সন্দেহ। এই বুঝি কোরোনাভাইরাস ধরে ফেলল। নিশ্চই এটা সবার ক্ষেত্রে একই অনুভুতি।

এই পরিস্থিতির শেষটা হয়তো আমরা জানি না। তবে মৃত্যু সব সময় নাকের ডগায় এটা এখন অন্তত বিশ্বাসে এসেছে সবার।

দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা হচ্ছে তা হয়তো এখনই বলা মুশকিল। তবে এটা পরিস্কার যে অন্তত ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে বেকার হবে। কারণ সত্যিই এটা ২০০৮-০৯ এর বিশ্বমন্দার চেয়ে বহুগুণ বেশি ভয়াবহ মন্দা হবে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে ২ কোটি ২০ লাখ মানূষ এখন বেকার। আমাদের তো আগেই ছিল প্রায় ৩০ লাখ বেকার। কোরেনা পরবর্তী বেকার কত হবে তা হয়তো এখনই অনুমান করা যাবে না।

স্বাস্থ্যগত ক্ষতি না হয় বাদই দিলাম। এমন একটা ঝুঁকি আসল যে, সারাবিশ্বই এখন অসহায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোন অভাস দিতে ব্যর্থ শতভাগ। এমন কি তাদের গবেষণা আর কার্যকারিতাই এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গত পাঁচ মাসেও একটা প্রতিষেধক আবিস্কার করতে পারল না এ সংস্থাটি। তাহলে কি বৈশ্বিক অর্থ, সংস্কৃতি, অন্যান্য যুদ্ধই মানুষকে গবেষণা থেকে দুরে রেখেছিল। নাকি মানুষ মনে করেছিল যে, তারা অপাজেয়। বেশি আত্মবিশ্বাস, দম্ভ, আর মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবজ্ঞা এবং নিজেদের সুপার পাওয়ারের অধিকারী মনে করাই কি কাল হয়েছে। আমার তো তাই মনে হয় যে, কোরোনা একটা বড় শিক্ষা, প্রকৃতির প্রতিশোধও বটে ।

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন।

শেয়ার করুন