অর্ধেকের বেশী পাঠ্যবই সরবরাহ

প্রকাশিত

ডেস্ক প্রতিবেদনঃ ২০১৬ সালে বিনামূল্যে বিতরণের অর্ধেকের বেশী পাঠ্যবই ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র পাল এ তথ্য জানান। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় অবস্থিত একটি স্কুলে এসব বই সরবরাহ করতে দেখা গেছে।

প্রাথমিকের বই ছাপা নিয়ে জটিলতা থাকলেও ডিসেম্বরের মধ্যে সব ধরনের বই সরবরাহ করা হবে বলেও জানিয়েছেন এনসিটিবি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকসহ সব স্তরের জন্য ৩৪ কোটির বেশী বই সরবরাহ করা হবে। এর মধ্যে ৫০ ভাগের বেশী বই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়।

তিনি আরও বলেন, মাধ্যমিকের সিংহভাগ বই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকের বই নিয়ে জটিলতা হওয়ায় কিছুটা পিছিয়ে আছে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে সব জায়গায় বই পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এবারও বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীরা নতুন বই হাতে পাবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্তরের চার কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৪ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৩২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৩টি চাররঙা নতুন বই প্রদান করেছিল সরকার।

এবার (২০১৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য) গড়ে মোট ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বেশী ধরে নতুন বই ছাপানো শুরু হয়। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, এবার মাধ্যমিকের এক কোটি চার লাখ ৬০ হাজার ৮৯৩ শিক্ষার্থীর জন্য ১১৪ বিষয়ের ১৬ কোটি ৩০ লাখ চার হাজার ৩৭৩টি, ইবতেদায়ীর ২৭ লাখ তিন হাজার ৯৮৪ শিক্ষার্থীর ৩৬ বিষয়ের এক কোটি ৯২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮০টি, দাখিল ও দাখিল ভোকেশনালের ২৩ লাখ ৪৪ হাজার ৪৬৯ শিক্ষার্থীর ৮৮ বিষয়ের তিন কোটি ৪৬ লাখ ৭৮ হাজার ৮২৯টি, এসএসসি ভোকেশনালের এক লাখ ৮৭ হাজার ১৫৩ শিক্ষার্থীর ১৮ বিষয়ের ২২ লাখ ৭১ হাজার ৮৩৬টি, প্রাথমিকের দুই কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ৩৫১ শিক্ষার্থীর ৩৩ বিষয়ের ১০ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার ১১টি, প্রাক-প্রাথমিকের তিন লাখ ২৮ হাজার ৫৩ শিক্ষার্থীর দুই বিষয়ের ৬৫ লাখ ৭৬ হাজার ১০৬টি বই ছাপানো হয়েছে।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বই ছাপানো, বাইন্ডিং ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত সকল কাজ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো করবে। কেবল তদারকির দায়িত্ব পালন করবে এনসিটিবি। এবার উপজেলায় বই পৌঁছাতে বই প্রতি ১৫ পয়সা পরিবহন খরচ ধরা হয়েছে বলেও জানিয়েছে এনসিটিবি।

এ ছাড়া মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিকের বইয়ের জন্য প্রায় ১৯ হাজার মেট্রিক টন কাগজ কিনতে এবার সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। এবার মাধ্যমিকের জন্য ৪৭৩ কোটি ও প্রাথমিকের জন্য ১৯৩ কোটি টাকাসহ মোট ৬৬৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল।

বিগত কয়েক বছরের ন্যায় এবারও পহেলা জানুয়ারিতে বই বিতরণের ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়নের শুরুতে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। কারণ ২৯ এপ্রিল প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সাড়ে ১১ কোটি এবং প্রাক-প্রাথমিকের আরও প্রায় এক কোটি বই ছাপার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছিল এনসিটিবি। ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের ৭৫০টি দরপত্র থেকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে প্রাথমিকের ২০টি এবং প্রাক-প্রাথমিকের দুটি দেশী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বাছাই করে এনসিটিবি। পরে সম্মতির জন্য ১৯ জুলাই এনসিটিবি চিঠি পাঠায় বিশ্বব্যাংকে। কিন্তু কম দামের জন্য মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিশ্বব্যাংক। কারণ প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিকের বইয়ের জন্য বাজারদর যাচাই করে এনসিটিবি সম্ভাব্য দর ঠিক করেছিল ৩৩০ কোটি টাকা। কিন্তু মনোনয়নপ্রাপ্ত মুদ্রণকারীরা দরপত্র জমা দিয়েছিলেন ২২১ কোটি টাকা খরচ উদ্বৃত ধরে। ১০৯ কোটি টাকা কমে নিম্নমানের বই ছাপা হবে আশঙ্কা করে বিশ্বব্যাংক টেন্ডার বাতিলের দাবি জানালেও তাতে রাজি হয়নি এনসিটিবি। ফলে আগস্টে বইয়ের কাগজ, ছাপা ও বাঁধাইয়ের মান নিশ্চিতের অঙ্গীকারের পাশাপাশি নজরদারি, ১০ শতাংশ থেকে জামানত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা, ৯০ দিনের মধ্যে ছাপা শেষ করার পর বইয়ের গুণগত মান ঠিক থাকলেই বিল দেওয়ার শর্তারোপ করে চিঠি পাঠায় বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংক বই ছাপানোর সাড়ে ৯ শতাংশ ঋণ প্রদান করে। বাকি অর্থ জাতীয় তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির শর্তারোপের প্রতিবাদে বাংলাদেশ মুদ্রণ সমিতি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব বই ছাপা বন্ধের ঘোষণা দিলে পুরো প্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। পরে শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের আগে বেসরকারিভাবে বই বিতরণের কারণে শিক্ষার্থীরা অনেক দেরিতে বই পেত। উচ্চমূল্যে কেনা এসব বইও ছিল নিম্নমানের।

২০১০ সালে প্রথমবারের মতো সরকার দশম শ্রেণী পর্যন্ত দুই কোটি ৭৬ লাখ ৬২ হাজার ৫২৯ শিক্ষার্থীকে ১৯ কোটির বেশী পাঠ্যবই বিনামূল্যে বিতরণ শুরু করে। ২০১১ সালে ২৩ কোটি, ২০১২ সালে প্রায় ২৭ কোটি, ২০১৩ সালে সাড়ে ৩১ কোটি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বছরের প্রথম দিন প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বিনামূল্যের বই বিতরণ করে আসছে।

এ ছাড়া দেশীয় মুদ্রণ মালিকদের বিরোধিতা থাকলেও ২০১০ সালে প্রথম প্রাথমিকের বিনামূল্যের বই ছাপাতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে সরকার। এরপর থেকে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই বই ছাপার কাজ পেত। এবার প্রথম ভারতীয়দের হটিয়ে সব স্তরের বই ছাপানোর কাজ পেয়েছে দেশী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো।

শেয়ার করুন