অমুসলিমদের লাশ পোড়ানোয় মুসলিমের অংশগ্রহণ : ধর্মতত্ব কি বলে?

প্রকাশিত

শারাফাত শরীফ : জীবিত-মৃত সকল মানুষ সম্মানের পাত্র। চাই সে আল্লাহর তায়ালার একত্ববাদকে স্বীকার করুক কিম্বা অস্বীকার করুক। কোরআন মাজিদে তিনি বলেন, “আমি বনী আদমকে সম্মানিত করেছি।”(২) মৃত আদম সন্তানকে ইসলাম জীবিত মানুষের মতই সম্মান করতে বলে।

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মৃত মানুষের হাড় ভাঙ্গা; জীবিত অবস্থায় হাড় ভাঙ্গার মতই অন্যায়।” (৩)

এজন্য মৃত্যুর পর মানুষের শরীরে সবধরণের আঘাত ইসলাম নিষেধ করে। আর গোসল দিয়ে তাকে দাফন করতে বলে। ঈমানদার হলে তাঁর জানাযা হবে, অন্যথায় কেবল দাফন হবে।

নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। মৃত্যু আমাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনকে থমকে দিয়েছে। আক্রান্ত জীবিত মানুষকে স্বজনরা একে একে ত্যাগ করছে; আর মৃতদের ছুড়ে ফেলছে। এর মাঝে কিছু মানুষ ইসলামের উদারতাকে আঁকড়ে ধরছে। তাঁরা মৃতকে মুসলিম-অমুসলিমে বিভাজন করে না। আল্লাহর সৃষ্ট বনী আদম হিসাবেই গ্রহণ করছে। কিন্তু যাঁরা এই ক্রান্তিকালে দেশ ও জাতির খেদমত করছে; তাঁদের ধর্মীয় কিছু নিয়মকানুন সম্পর্কে জানা থাকা দরকার। ধর্ম আমাদের মানবতা, উদারতার পাশাপাশি শৃঙ্খলার কথাও বলে।

একজন মুসলিম ইন্তেকাল করলে তাঁর জানাযা ও দাফনের কাজ সাধারণভাবেই হবে। নিজেদের সেফটির প্রতি লক্ষ রেখে। কিন্তু অমুসলিম ব্যক্তির পরিবার ও সমাজের নির্দিষ্ট কিছু রীতিনীতি থাকে। ইসলাম তাঁদেরকে এগুলো করতে বাধা প্রদান করে না। এজন্য যাঁরা জনসেবার দ্বায়িত্ব পালন করছেন; তাঁরা অমুসলিম ব্যক্তির লাশ তার আত্মীয়-স্বজনের কাছে অর্পণ করবে। তারা তাদের মত করে লাশের ব্যবস্থা নিবে। কিন্তু যদি মৃতের আত্মীয়-স্বজন লাশ গ্রহণ করতে না চায়; তাহলে লাশকে নিরাপদ কোথাও রেখে আসবে। যেন তাদের ধর্মালম্বী কেউ লাশের ব্যবস্থা নিতে পারে।

এই বিষয়ে ইমাম বুরহানুদ্দীন মাহমুদ বিন আহমদ বুখারী র. (মৃ. ৬১৬ হি.) তাঁর রচিত মুহিতুল বুরহানি (৫) ও যখীরাতুল বুরহানী (৬) নামক কিতাবে বলেন, ‘‘একজন মুসলিম তাঁর নিকট আত্মীয় অমুসলিমের কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে; যদি মৃত ব্যক্তির ধর্মালম্বী নিকট আত্মীয় কেউ না থাকে। আর যদি থাকে তাহলে কোনো মুসলিম মৃতের দায়দায়িত্ব নিবে না। বরং লাশ তাদের নিকট হস্তান্তর করবে। যেনো তারা তাদের মত করে কাফন-দাফন করতে পারে।”

ইমাম আ‘লাম ইবনুল আলা তাঁর রচিত “ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া” কিতাবেও উক্ত বক্তব্যটি নিয়ে এসেছেন। (৭)

যদি অমুসলিম ব্যক্তির আত্মীয় কিংম্বা ধর্মালম্বী কেউ দায়িত্ব নিতে না চায়; এক্ষেত্রে মূলত করণীয় হল গোসল দিয়ে কাফন পরিয়ে দাফন করে দেওয়া। কিন্তু বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে কোন অমুসলিমকে মুসলমানরা দাফন করলে সেটা নতুন কোন ফিতনার দরজা খুলে দিতে পারে। তাই যথাসম্ভব লাশ তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করাই উচিত হবে। একান্ত অপারগ হলে শ্মশান কর্তৃপক্ষের কাছেও পৌঁছানো যেতে পারে।

কিন্তু লাশ পৌঁছে দেওয়ার পর তাদের বিশেষ ধর্মীয় কাজে কোনভাবেই অংশগ্রহণ করা যাবে না। বিশেষত আরথিতে অংশগ্রহণ করা যাবে না। আমরা অমুসলিমদেরকে তাদের ধর্ম পালন করতে দিবো। কিন্তু তাতে অংশগ্রহণ করবো না। এটাই মানবতা। ধর্মীয় রীতি পালনে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে ইসলাম স্বীকার করে। কিন্তু কোন মুসলমানের জন্য অন্য ধর্মের কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও উৎসাহ প্রদানকে ইসলাম অনুমোদন করে না।

এই সম্পর্কে মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী র. (মৃ. ১৪১৭ হি.) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। যা তাঁর ফাতাওয়ার সংকলন “ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া” নামক কিতাবে রয়েছে।

তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছে, “বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যায়; অমুসলিমরা মৃত মুসলিম ব্যক্তির জানাযার সাথে কবরস্থানে যায়। এবং অনেক সময় লাশের খাটিয়াও ধরে নিয়ে যায়। এমনিভাবে মুসলিম ব্যক্তিরা অমুসলিমদের শেষকৃত্যে যায়। এবং অনেক সময় আরথিও ধরে। উত্তরে তিনি লিখেছেন:- “পড়শী অমুসলিম অসুস্থ হলে তার খোঁজখবর নেওয়া, এবং তার প্রয়োজনীয় কাজে সাহায্য ও সহযোগীতার করার ব্যপারে ইসলাম উৎসাহ দেয়। কিন্তু আরথি বা মুখাগ্নি করা কিংবা মৃতদেহ পোড়ানোর জন্য শ্মশানে যাওয়ার অনুমোদন ইসলামে নেই। এমন কাজ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। এমনিভাবে মুসলিমদের জানাযায় অমুসলিমদের অংশগ্রহণেরও সুযোগ নেই। ” (৯)

টিকা:
(১) সূরা আল-আনকাবূত, আয়াত ৫৭
(২) সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৭০
(৩) সুনানে আবী দাউদ: ২৬৭৫, মুসনাদে আহমদ: ১৬০৩৪
(৪) সূরা ত্বহা: আয়াত ৫৫
(৫) মুহিতুল বুরহানি: মাকতাবায়ে হাক্বানিয়া: ২/৩২৬, দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যা: ২/১৯৫
(৬) যাখিরাতুল বুরহানী: দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যা: ২/৪৬২
(৭) তাতারখানিয়া: মাকতাবায়ে যাকারিয়্যা: ২/৭৮
(৮) বাদাইয়ুস সানাইয়: দারুল হাদিস: ৫/৫৫৪, দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যা: ৫/৫৭১
(৯) ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: মাকতাবায়ে যাকারিয়া: ১৩/২৭

-লেখক
দাওরায়ে হাদিস: দারুল উলূম দেওবন্দ, ইন্ডিয়া

শেয়ার করুন